ভারতের বন্ধুত্ব চাই দাসত্ব নয় -বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী (বীর উত্তম)

0
4

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অহঙ্কার বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী (বীর উত্তম) বলেছেন, ‘বাংলাদেশের বিগত ভোটারবিহীন নির্বাচনে ভারত সুজাতা সিংয়ের মাধ্যমে উলঙ্গ হস্তক্ষেপ করে অন্যায় ও অনৈতিক কাজ করেছে। বাংলাদেশের জনগণ এবং ভারতের জনগণ কেউই এই বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি। এতে বেশি ক্ষতি হয়েছে তৎকালীন ভারতের কংগ্রেস সরকারেরই। আমরা ভারতের সাথে বন্ধুত্ব চাই, দাসত্ব নয় এবং দুই দেশের মধ্যে এই বন্ধুত্বও হতে হবে অবশ্যই সমমর্যাদার ভিত্তিতে এবং সেটা কোনভাবেই আমাদের জাতীয় স্বার্থকে বিকিয়ে নয়।’ গতকাল দৈনিক ইনকিলাবকে দেয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে হেফাজতে ইসলাম, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতেও বিভিন্ন প্রশ্নের অত্যন্ত খোলামেলা জবাব দিয়েছেন তিনি। ইনকিলাব পাঠকদের জন্য বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সাক্ষাতকারটি তুলে ধরা হলো।

ইনকিলাব : নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট দেশের রাজনীতিতে কতটা ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে আপনি মনে করেন?
কাদের সিদ্দিকী : আমরা দেশে একটা বিশুদ্ধ গণতন্ত্র চাই। বেদখল হয়ে যাওয়া জনগণের অধিকারকে ফিরিয়ে আনতে চাই। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমরা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছি। সফলতার সম্ভবনা না থাকলে সেখানে কেউ কোন কাজ করে না। আমাদের ঐক্যফ্রন্টে সকলেই বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। দেশের বরেণ্য ব্যক্তিত্বরা একত্রিত হয়েছেন। দেশের জনগনও ঐক্যফ্রন্টকে দারুণ আগ্রহ আর উৎসাহের সাথে গ্রহণ করেছে। কাজেই আমি মহান আল্লাহর কাছে ভরসা রেখে নিশ্চিত করেই বলতে পারি, ঐক্যফ্রন্ট সফল হবেই। জনগণের বিজয় এবার সুনিশ্চিত।
ইনকিলাব : বর্তমান নির্বাচন কমিশনের উপর আপনার আস্থা কতটুকু?
কাদের সিদ্দিকী : একটুও নাই। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের যেসব কীর্তিকলাপ আমরা বেশ কিছুদিন ধরে দেখে আসছি তাতে এই কমিশনের অধীন সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে সেটা কেউই আশাও করে না বিশ্বাসও করে না। আমাদের দেশে অতীতেও অনেক সময় অনেক অথর্ব নির্বাচন কমিশন এসেছে কিন্তু বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মত এত অথর্ব আর সরকারের আজ্ঞাবহ কমিশন কখনো আসেনি।

ইনকিলাব : নির্বাচনের তারিখ সাত দিন পেছানো হয়েছে। আপনারা তারিখ আরো পেছাতে বলেছেন। এই তারিখ পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে কি নির্বাচনে কোন জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে?
কাদের সিদ্দিকী : বর্তমান নির্বাচন কমিশনের আচরণটাই হচ্ছে ঘোড়ার আগে গাড়ী চালিয়ে দেয়ার মত। সবসময় নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসে তাদের সকলের মতামত নিয়ে তারিখ নির্ধারণ করে থাকে। কিন্তু শুধু এবারই তার ব্যাতিক্রম হলো। এই যে সাত দিন নির্বাচনের তারিখ পেছানো হলো তাতে তো বিষয়টি একেবারেই পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে তারা সম্পূর্ণরূপে সরকারের আজ্ঞাবহ হয়েই এটা করেছে। তাদের যদি সামান্য জ্ঞানও থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই তারা কোনভাবেই বড়দিনের আগে ও নববর্ষের দিনে নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করতো না। এতে একজন শিশুরও বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না এর পেছনে যে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য আছে।

ইনকিলাব : আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে সিট ভাগাভাগি নিয়ে আপনাদের ঐক্যফ্রন্টের এই ঐক্য কি শেষ পর্যন্ত অটুট থাকবে বলে আপনি মনে করেন?
কাদের সিদ্দিকী : আমার দৃঢ় বিশ্বাস অবশ্যই এই ঐক্য অটুট থাকবে ইনশাআল্লাহ। আমরা সকলেই জাতীয় স্বার্থে নির্লোভ ত্যাগের মানসিকতা নিয়েই এই ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়েছি। দেশকে বাঁচাতে ঐক্যফ্রন্টের ঐক্যের কোন বিকল্প নেই।

ইনকিলাব : সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত জনসভায় বক্তৃতাকালে আপনি হেফাজতে ইসলামের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। এর কারণ কি?
কাদের সিদ্দিকী : সময় সময় এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা ভুলা যাওয়া যায় না। হৃদয়ে শুধু রক্তক্ষরণ হয়। বাঙালির জন্য মুসলমানদের জন্য শাপলা চত্বরের হেফাজতের রক্তপ্রবাহের যন্ত্রণা হাজার বছর থাকবে। অনেকেই হয়তো ভুলে গেছে, রাজনীতির স্বার্থে হেফাজতকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে কিন্তু শাপলা চত্বরের ঘটনায় আল্লাহ ও রাসুলের (সঃ) অবমাননা কেউ মেনে নিতে পারে না। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি শুধু শাপলা চত্বরের ঘটনায় আওয়ামীলীগ তার অন্ধ ও কট্টরপন্থী ভোটারদেরও কমপক্ষে ৫% ভোট হারাবে। প্রধানমন্ত্রী আল্লামা শফির সংবর্ধনা নিয়ে তার কাছ থেকে ‘কওমি জননী’ উপাধী নিলেন। অথচ নিশ্চয়ই দেশবাসির মনে আছে শাপলা চত্বরের সেদিনের ঘটনার দিন যখন বাইতুল মোকাররমে পবিত্র কোরার শরিফ পোড়ানো হলো তখন সরকার অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে অভিযোগ করে বলেছিল যে এটা ছিল হেফাজতের কাজ এবং হেফাজতের লোকরাই কোরআন শরীফ পুড়িয়েছিল। যদিও সরকারের এই কথা ও অভিযোগ জনগণ বিশ্বাস করেনি এবং জনগনের ধারণা ছিল আওয়ামীলীগের লোকেরাই তখন এসব করে দোষটা চাপিয়েছিল নিরপরাধ হেফাজতের উপরে। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে যদি আমরা তর্কের খাতিরে ধরেই নেই যে সরকারের অভিযোগই সঠিক তাহলে সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী কিভাবে সেই হেফাজতকে নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এমন একটি অনুষ্ঠান করলেন এবং তখন কি তার একবারও মনে হলো না তিনি কোরআন শরীফ পোড়ানোর দায়ে অভিযুক্তদের সাথে বসছেন অপরাধীদের সাথে বসছেন? সেদিন শাপলা চত্বরে যারা নিহত হয়েছেন রক্ত দিয়েছেন তাদের মা বাবার বুকের আর্তনাদের ভাষা কি আল্লামা শফি কিছুই শুনলেন না? আল্লামা শফি সরকারের সাথে হাত মেলালেন অথচ একবারও ভাবলেন না এত সস্তায় মানুষের রক্ত ও জীবন বিক্রি করা যায় কিভাবে? আল্লামা শফি বিক্রি হতে পারেন, ভুলে যেতে পারেন কিন্তু দেশের মানুষ সেদিনের ঘটনা ভুলে নাই। মানুষের শরীর এবং রক্ত পানি দিয়ে ধোয়া যায় কিন্তু স্মৃতি থেকে তার ভাবনা কোনদিন মুছে ফেলা যায় না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে যেমন মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা যায়নি ঠিক তেমনি হেফাজতের শাপলা চত্বরের রক্তও কোন দিন মুমিন মুসলমানদের অন্তর থেকে মুছে ফেলা যাবে না।

ইনকিলাব : কিন্তু অনেকেই তো মনে করছেন হেফাজতের বিশাল ভোট ব্যাংক দেশের ভোটের রাজনীতিতে অনেক বড় ফ্যাক্টর?
কাদের সিদ্দিকী : নিঃসন্দেহে কথাটি সঠিক তবে অবশ্যই সেটা শতভাগ আওয়ামীলীগ এবং নৌকার বিরুদ্ধে। এবারের ভোটেই সেটা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হবে আল্লামা শফির যে কোন অনুসারী নাই। আল্লামা শফির সাথে সেদিন যারা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসেছিল তারাও কেউ রক্ত ঝরানো নৌকায় ভোট দেবে না। তারা এসেছিল শুধুই আসার বাধ্যবাধকতায় আর নির্দেশনায়।

ইনকিলাব : বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবসময় একটি আলোচিত বিষয় হচ্ছে ভারতের হস্তক্ষেপ। আপনি তো দীর্ঘদিন ভারতে ছিলেন। এই ব্যাপারে আপনার সুস্পষ্ট বক্তব্য কি?
কাদের সিদ্দিকী : অনেক সময় অনেক কিছু হয় কিন্তু সবসময় আবার সেটা হয় না। ভারত বাংলাদেশের জনগণের বন্ধু, প্রতিবেশি। কিন্তু সেই সুযোগে বাংলাদেশের বিগত ভোটারবিহীন নির্বাচনে ভারত প্রকাশ্যে আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় রাখার জন্য সুজাতা সিংয়ের মাধ্যমে যে উলঙ্গ হস্তক্ষেপ করেছিল তাতে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে ভারতের মর্যাদা অনেকাংশে নষ্ট হয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই নয় ভারত যে একটা গনতান্ত্রিক দেশ সারা বিশ্বের কাছে ভারতের ইমেজও তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। আমি মনে করি আমাদের নির্বাচনে এভাবে ভারতের হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তার করাটা অনেক বড় অন্যায় ও অনৈতিক কাজ। ভারতের গত সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস সরকারের পতন ও অপ্রত্যাশিত কম ভোট পাওয়ার পেছনে যে কয়টি কারণ বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল তার মধ্যে বাংলাদেশের নির্বাচনে উলঙ্গ হস্তক্ষেপের বিষয়টিও ছিল অন্যতম। বিগত দিনে বেশ কয়েকবার আমি ভারতে গিয়ে দেখেছি তাদের দেশের সাধারণ মানুষও বাংলাদেশের নির্বাচনে অমন নগ্ন হস্তক্ষেপ পছন্দ করেনি। আমার দীর্ঘ ভারতবাসের সময় সেখানকার কোন নেতার মধ্যে তখন এমন প্রবণতা দেখিনি। এখনো ভারতের প্রবীন নেতাদের মধ্যে বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্বেরই আগ্রহ আছে খরবদারি করার কোন আগ্রহ দেখি না। আমার মনে হয় আওয়ামীলীগের প্রতি ভারতের অন্ধ কামনা-বাসনা অনেক কমে গেছে এবং আওয়ামীলীগকে তারা হাত বাড়িয়ে উলঙ্গ সমর্থন করে তাদের দেশবাসীর কাছে আর অপ্রিয় হবে না। তবে এতকিছুর পরেও যদি ভারত আবারো বাংলাদেশের নির্বাচনে প্রভার বিস্তার করার চেষ্টা করে তাহলে বাংলাদেশের মানুষের সেটা প্রতিরোধ করার যথেষ্ঠ ক্ষমতা আছে। মাথা ঠা-া করে ভারতের এটা ভাবতে হবে যে আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান হয়েও যেখানে পিন্ডির অন্যায় কতৃত্ব মানি নাই সেখানে দিল্লির কতৃত্ব মানবো কি করে? আমরা ভারতের বন্ধুত্ব চাই, দাসত্ব নয়। আর বন্ধুত্বও হতে হবে অবশ্যই সমমর্যাদার ভিত্তিতে এবং সেটা কোনভাবেই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে বিকিয়ে নয়।

ইনকিলাব : বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযোদ্ধা-রাজাকার বিতর্ক আর কতকাল চলবে?
কাদের সিদ্দিকী : মুক্তিযোদ্ধারা যেমন দেশের কাছে মহিমান্বিত তেমনি রাজাকাররা ছিল ঘৃণিত। কিন্তু এখন রাজনীতির কারণে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকেও রাজাকার বলে যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের মহিমাকে ম্লান করা হচ্ছে ঠিক তেমনি রাজাকারের প্রতিও মানুষের স্বাভাবিক ঘৃণা অনেক কমে গেছে এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের কাউকে কাউকে রাজাকার বলায় রাজাকাররাই বরং এখন গর্ববোধ করার অবলম্বন পাচ্ছে। স্বাধীনতার পর কাউকে রাজাকার বললে সে যেমন ¤্রয়িমান হয়ে যেত এখন আর তেমন হয় না। কারণ কাদের সিদ্দিকী যখন রাজাকার তখন আর রাজাকার হতে লজ্জা কোথায়?

ইনকিলাব : নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে বাংলাদেশে বসবাসকারী হিন্দু ধর্মের মানুষদের ভোটের ভূমিকাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
কাদের সিদ্দিকী : আমাদের দেশের রাজনীতিতে একটা কথা বেশ প্রচলিত আছে যে হিন্দু ধর্মের লোকেরা সব সময় আওয়ামীলীগকে পছন্দ করে এবং আওয়ামীলীগকে ভোট দেয়। কিন্তু বাস্তবে ঐ অবস্থা এখন আর নাই। হিন্দুরা যে আওয়ামীলীগের কোনো কেনা সম্পত্তি নয় এটাই এবারের নির্বাচনে প্রমাণিত হবে। আওয়ামীলীগ এবার হিন্দুদের ৫০ শতাংশ ভোটও পাবে না। কারণ বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন গ্রামে গঞ্জে হিন্দু ধর্মের লোকদের উপর যেরকম অন্যায়, অত্যাচার করা হয়েছে পাকিস্তান আমলেও তেমনটা ছিল না। শহরের ভালো জায়গায় বসে সেটা কখনো দেখা যায় না।

ইনকিলাব : কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ সরকার তো দেশে অনেক বড় বড় উন্নয়ন কাজ করেছে। নিশ্চয়ই সেটার একটা প্রভাব নির্বাচনে পড়বে। আওয়ামীলীগ নিশ্চয়ই সেটার একটা সুফলও পাবে?
কাদের সিদ্দিকী : দেখুন, উন্নয়ন দিয়ে কখনো রাজনীতি হয় না। তাই যদি হত তাহলে আইয়ুব খানকে নিশ্চয়ই ক্ষমতা থেকে সরানো যেত না। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও উন্নয়ন কম করেননি। কিন্তু তিনি কি ক্ষমতায় থাকতে পেরেছেন? শুধু উন্নয়ন নয় রাজনীতির সফলতা হচ্ছে সাধারণ জনগনের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া, যেটা বঙ্গবন্ধু পেরেছিলেন। এখন ১০০ জন সাধারণ মানুষের সাথে কথা বললে যখন দেখা যায় তাদের ৯০ জনই কাউকে গালি দিচ্ছে তখন বুঝতে হবে নিশ্চয়ই সরকার সঠিক পথে নাই।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে আপনার লিখুন