কুমিল্লায় ইসলাম ও অলিমান দেওয়ান শাহ্ (রহঃ)

0
138

সৈকত মজুমদার,ঢাকা: পীর আউলিয়ার দেশ বাংলাদেশ। ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলায় যুগেযুগে বহু আউলিয়া কেরামের আগমন ঘটেছে। পৃথিরীর অনেক দেশে রাষ্ট্রশক্তির মাধ্যমে ইসলামের বিস্তৃতি হলেও বঙ্গ অঞ্চলে আউলিয়া কেরামের দাওয়াতের মাধ্যমেই ইসলামের বিস্তৃতি লাভ করে। সমুদ্রপথে আরব বনিকদের মাধ্যমে বাংলায় ইসলামের সূচনা হলে পূর্ণাঙ্গ বিস্তার লাভ করে স্থলপথে আগমনকারী হযরত শাহজালাল (রহঃ) এবং তাঁর সফরসঙ্গীদের মাধ্যমে। হযরত শাহজালাল (রঃ) ও তার সফরসঙ্গী তাদের বংশধর এবং শিষ্যদের ইসলাম প্রচারের সুবিদার্থে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপনের নির্দেশ দিয়ে যান। এরই ধারাবিকতায় বৃহত্তর ত্রিপুরা (আধুনা কুমিল্লা ও নোয়াখালী) অঞ্চলে প্রায় তিনশত জন আউলিয়া কেরামের আগমন ঘটে। হযরত অলিমান দেওয়ান শাহ (রহঃ) ছিলেন তাদের অন্যতম।

হযরত অলিমান দেওয়ান শাহ (রঃ) আনুমানিক সপ্তাদশ শতাব্দীতে শাহ পদবীধারী আরব বংশদ্ভূত একটি সম্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ।

তিনি হযরত শাহ জালালে সফরসঙ্গী আরবের ইয়েমেন হতে আগত জনৈক আউলিয়ার চতুর্থ অদঃস্তন পুরুষ। পারিবারিকভাবেই তিনি পবিত্র কুরআন ও হাদিস বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন। তাঁর পূর্বসূরিদের নির্দেশমতে কয়েকজন সফরসঙ্গী নিয়ে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ত্রিপুরায় (আধুনিক কুমিল্লা) আগমন করেন। তাঁর সফরসঙ্গীদের মধ্যে হযরত জামাল শাহ (রঃ) অন্যতম। তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল লাল মাটিযুক্ত (বর্তমান লালমাই) স্থানে গিয়ে প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বসতিস্থাপন করতে এবং বলা হয়েছিল তাঁদের বাহনই তোমাদের ইসলাম প্রচার ও বসতিস্থাপন স্থান নির্ধারণ করবে। হযরত অলিমান দেওয়ান শাহ (রহঃ) নৌপথে ডাকাতিয়া নদী পড়ি দিয়ে ত্রিপুরার হোমনাবাদ পরগনার আগদিয়া (বর্তমান আকদিয়া) ভূখন্ডে বসতিস্থাপন করেন এবং এই অঞ্চলের মানুষদের ইসলামের দাওয়াত দেন।

তিনশত আউলিয়ার পূণ্যভূমি ত্রিপুরা । এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে রয়েছে এ সকল ওলি আউলিয়াদের অন্যন্য অবদান ও কৃতিত্ব। হিন্দু ও বৌদ্ধ অধ্যুষিত ত্রিপুরা অঞ্চলে আউলিয়া কেরামের মাধ্যমেই আল্লাহ তা’আলা মানুষকে হেদায়াত করেন। তাদের ত্যাগ ও নিরলস চেষ্টার অবদানে এ দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ হয়ে উঠে। শিরকি ও একাধিক উপাসনার পথ ছেড়ে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান ও বিশ্বাস স্থাপন করে। এ অঞ্চলে ওলি আউলিয়াদের মধ্যে ছিলেন হযরত অলিমান দেওয়ান শাহ (রহ.) ছিলেন অন্যতম ।
হজরত অলিমান দেওয়ান শাহ আগদিয়াসহ হোমনাবাদ ও রৌশনাবাদের বিভিন্ন এলাকায় ইসলাম প্রচার করেছেন। তিনি এ অঞ্চলে একজন প্রখ্যাত ইসলাম প্রচারক ছিলেন। হজরত অলিমান দেওয়ান শাহ তার শেষ জীবন পর্যন্ত ধর্ম প্রচার করে গেছেন। ইসলাম প্রচারে তিনি অতুলনীয় ভূমিকা পালন করেছেন। আগদিয়া থেকে দুর-দুরন্তে যেয়ে মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দিতেন। তার অতুলনীয় ব্যবহার ও অন্যান্য গুণাবলীর দিকে আকৃষ্ট হয়ে বহু হিন্দু ধর্মালম্বী মানুষ দলে দলে ইসলামের শান্তির বাণী গ্রহণ করেন। এর ফলে হিন্দু অধ্যুষিত এই অঞ্চল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠে। ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আসা এসব নওমুসলিমদের তিনি তাঁর বাড়ির পাশে অবস্থিত তাকিয়া তথা দরবারে নিয়ে আসতেন এবং এ সকল মানুষকে ইসলাম ধর্ম ও জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান দান করেন। একই সঙ্গ তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনার্থে তিনি তার বংশধর ও খলিফা তথা শিষ্যদের ইসলাম প্রচারের ধারাবিকতা বজায় রাখার আদেশ দেন। এরই ধারাবিকতায় তাঁরপুত্র খওয়াজ শাহ মজুমদার দ্বীন প্রচারের ধারাবিকতা বজায় রাখেন। ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি তিনি আগদিয়াতে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থারও প্রবর্তন করেন। তিনি ছিলেন আগদিয়া মৌজার অধিকর্তা। তাঁর ইন্তেকালের পর ধারাবাহিকভাবে তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র জাহের মজুমদার এবং দৌহিত্র আজগর আলী মজুমদার আগদিয়ার সমাজ ব্যবস্থা পরিচালনা করেন।

হযরত অলিমান দেওয়ান শাহ (রঃ) এর ইন্তেকালের পর আগদিয়ার মাটিতে তাঁকে দাফন করা হয় । আজও হাজারো ভক্তের ভালোবাসা ও দোয়ায় সিক্ত হচ্ছে তার কবর। যিনি ইসলাম প্রচারক হিসেবে কুমিল্লা অঞ্চলের উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছেন। বেঁচে আছেন সহস্র ধর্মপ্রান মুসলিমের হৃদয় ও মননে।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে আপনার লিখুন