ঈদুল আযহায় রাসূল (সা) যা যা করতেন এবং কুরবানির পশু যবেহর সঠিক নিয়ম

0
21

১। “রাসূল (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন কিছু খেয়ে বের হতেন আর ঈদুল আযহায় ফিরে আসার আগে কিছুই খেতেন না। ফিরে এসে তার কুরবানির পশুর মাংস থেকে ভক্ষণ করতেন।” (হাকিম ১/৪৩৩, তিরমিযি ২/৪২৬ সহিহ)
.
২। “রাসূল (সা.) ঈদের দিন (যেতে-ফিরতে) রাস্তা পরিবর্তন করতেন।” (ইবনে মাজাহ : ১০৭৮)
.
৩। “রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনে পায়ে হেঁটে বের হতেন।” (সহিহ বুখারি : ৯৮৬)
.
৪। ঈদগাহে যাতায়াতের সময় উচ্চস্বরে তাকবির বলা সুন্নাত। ইবনে উমার (রা.) উভয় ঈদে তাকবির বলে বলে ঈদগাহে যেতেন। (আল মুসতাদরাক : ১০৫৬) ঈদুল আযহার দিনে সাহাবাগণ অধিক তাকবির বলতেন। (ঐ: ১০৫৭)
.
৫। “রাসূলুল্লাহ (সা.) ঈদের নামাযের পূর্বে কোন নামায পড়তেন না। তবে নামাযের পর গৃহে প্রত্যাবর্তন করে দুই রাকাত নামায পড়তেন।” (ইবনে মাজাহ: ১২৯৩ এবং আবু দাউদ: ২৫৫)
.
৬। পরস্পরকে ”তাক্বব্বাল আল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম।” বলা যার অর্থ “আল্লাহ আমাদের এবং আপনার (ইবাদত-বন্দেগী) কবুল করুন।” বলে শুভেচ্ছা জানানো। (মু’জামুল কাবির: ১২৩)। “ঈদ মুবারক” বলাও জায়েয, তবে সুন্নাহ্ না।
________________
.
কুরবানির পশু যবেহর সঠিক নিয়ম –
.
কুরবানি করার সময় হল দশই যুলহজ্জ ঈদের নামাযের পর। নামাযের পূর্বে কেউ যবেহ করলে তার কুরবানী হয় না এবং নামাযের পর ওর পরিবর্তে কুরবানী করা জরুরী হয়।
.
জুনদুব বিন সুফ্য়্যান আল-বাজালী বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কুরবানীতে উপস্থিত ছিলাম। তিনি যখন নামায সমাপ্ত করলেন তখন কতক ছাগ ও মেষকে দেখলেন যবেহ করা হয়ে গেছে। অতঃপর বললেন, ‘‘যে ব্যক্তি নামাযের পূর্বে যবেহ করেছে, সে যেন ওর পরিবর্তে আর এক পশু যবেহ করে। আর যে ব্যক্তি যবেহ করে নি, সে যেন আল্লাহর নাম নিয়ে যবেহ করে।’’ (সহিহ বুখারী)
.
.
কুরবানির পশু জবাইয়ের পরপর তার দ্রুত মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য গলায় খুঁচিয়ে স্পাইনাল কর্ড বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।
.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
.
আল্লাহ তাআলা সকল কিছুর উপর অনুগ্রহকে অপরিহার্য করেছেন। এতএব, যখন যবেহ করবে তো উত্তম পদ্ধতিতে যবেহ কর। এবং প্রত্যেকে তার ছুরিতে শান দিবে, যেন জবাইয়ের প্রাণির বেশি কষ্ট না হয়। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৫৫; আবু দাউদ, হাদীস ২৮১৫; জামে তিরমিযী, হাদীস ১৪০৯; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৪৪০৫)
.
অনেকে যবাইয়ের পর পশু ঠাণ্ডা হওয়ার পূর্বেই চামড়া ছিলার কাজ শুরু করে দেয়, যা মাকরূহ। এ থেকে বিরত থাকা জরুরি।
.
রিদওয়ান হাসান লিখেছেন, “আপনার পশুটিকে তাড়াতাড়ি নিস্তেজ করার জন্যে কিংবা পশুটিকে কষ্ট না দেয়ার জন্যে অনেকে স্পাইনাল কর্ডে অাঘাত করে থাকে। অথচ কোরবানির পশু জবেহ দেয়ার সবচে কম কষ্টদায়ক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি হলো, খুব ধারালো ছুরি দিয়ে পশুর গলার চামড়া, তারপর শ্বাসনালী (Trachea), খাদ্যনালী ও ব্রেইনে রক্তবাহী প্রধান দুটি ধমনী ক্যারোটিড আর্টারি (Carotid artery) ও প্রধান দুটি শিরা (Jugular Veins) কেটে ফেলা। এই আর্টারি কাটার সাথে সাথেই পশুর শরীরের সব রক্তপ্রবাহিত হয়ে যায়। এরপর সে আর কোন ব্যথা অনুভব করে না। আর এ কারণেই ইসলামে ভোতা ছুরি-চাকু দিয়ে জবেহ করা মানা আছে।
.
জেনে রাখা ভালো, প্রত্যেক পশুর পিঠে থাকে একটি মেরুদণ্ড বা স্পাইনাল কর্ড। এই স্পাইনাল কর্ডের যোগাযোগ শুধু পশুর পিঠেই নয়, গলা অবধি স্পাইনাল কর্ডের যোগাযোগ আছে। শুধু তাই নয়, স্পাইনাল কর্ড ব্রেইনের সাথে আমাদের শরীরের সব পেশীগুলোর যোগাযোগ রক্ষা করে। তাই যখনি পশুর মূল তিনটি রগ কাটার কারণে রক্ত বের হতে থাকে, ব্রেইন হৃৎপিণ্ডকে মেরুদণ্ডের মাধ্যমে সিগন্যালাইজ করে। হার্ট তখন আরও জোরেজোরে পাম্প করে এবং ব্রেইন প্রচুর সিগন্যাল দিতে থাকে, ফলে শরীর থেকে সব রক্ত খুব অল্প সময়ে বের হয়ে যায়। এতে মাংসের মধ্যে কোন রক্ত থাকে না।
.
পক্ষান্তরে স্পাইনাল কর্ডে আঘাত করলে এই যোগাযোগ নষ্ট হয়ে যায়। আর ব্রেইনের সিগন্যাল ব্যাতিত যেহেতু হার্ট পাম্পিং সম্ভব নয়, যার কারণে শরীর থেকে যথেষ্ট রক্ত বের হয় না। আর রক্তে জীবাণু থাকার আশঙ্কা আছে, তাই রক্তসমেত গোস্তভক্ষণ কোরবানি মাকরুহ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
.
তবে শেষ কথা হলো, কোরবানির পশুর মূল তিনটি রগ কাটার পর পশুটি যেভাবেই মারা যাক, কোরবানি সহিহ হবে! তবে স্পাইনাল কর্ডে আঘাতের ফলে যদি রক্তপ্রবাহে বিচ্যুতি ঘটে, তাহলে মাকরুহে তাহরিমি হবে। কারণ, কোরবানির পশুর সাথে মিশ্র ইবাদতের মধ্যে রক্তপ্রবাহটাও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। তাই মানুষের ত্রুটির কারণে রক্তপ্রবাহ না হলে মাকরুহে তাহরিমি হবে।”
.
মাকরূহে তাহরিমি কিছু করা শরিয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয। এটি হারামের কাছাকাছি। সুতরাং এটি থেকে বিরত থাকা জরুরি। উলামায়ে কিরাম স্পাইনাল কর্ড বিচ্ছিন্ন করা ক্ষেত্রবিশেষ নাজায়েয বলেন। তাই, সবাই সচেতন হোন এবং নিজ নিজ পরিচিত অঙ্গনে এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করুন।
.
তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম। ঈদ মোবারক।

মন্তব্য করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন!
দয়া করে আপনার লিখুন