সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা কত?
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ রক্ষা, মনের ভাব প্রকাশ থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যও চলছে এই মাধ্যমকে কেন্দ্র করে।
প্রশ্ন জাগতে পারে, আসলেই কত মানুষ ব্যবহার করেন সোশ্যাল মিডিয়া...
সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক মাধ্যম মানুষের অন্যতম যোগাযোগমাধ্যমে পরিণত হয়েছে। সরাসরি মিথস্ক্রিয়া না হলেও পৃথিবীজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে কয়েক কোটি মানুষ। এখানে চাইলেই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়। তাইতো স্মার্টফোনে বুঁদ হয়ে থাকা বেশিরভাগ মানুষই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। এ মাধ্যম ঘিরে এক আলাদা জগৎ তৈরি হয়েছে মানুষের। প্রায় সবাই দৈনন্দিন জীবনের নানা ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করতে পছন্দ করেন। চলে নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা, তর্কবিতর্ক। প্রশ্ন হতে পারে, আসলেই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করেন কত মানুষ? সোশ্যাল মিডিয়ার নানান দিক নিয়েই আজকের লেখার অবতারণা।
প্রথম সোশ্যাল মিডিয়া
মানুষকে একটা মাধ্যমে একত্র করে যোগাযোগের ক্ষেত্র সৃষ্টির ভাবনা প্রথম এসেছিল গত শতকের শেষের দিকে। ১৯৯৬ সালের মে মাসে অ্যান্ড্রু ওয়েইনরিচ নামে এক ভদ্রলোক সামাজিক নেটওয়ার্কিং সাইট চালু করেন, যার নাম ছিল ‘সিক্স ডিগ্রি’। এক বছর পর এর কার্যক্রম শুরু হয়। এ সাইটটিতে প্রোফাইল তৈরি করা যেত, বন্ধুদের প্রোফাইলে যুক্ত করা যেত, নিজের তথ্য জানাতে পারত ব্যবহারকারী। কিন্তু সে সময় ইন্টারনেট খুব বেশি লোক ব্যবহার না করায় সোশ্যাল মিডিয়াটিও জনপ্রিয়তা পায়নি। তবে ‘সিক্স ডিগ্রি’কে বলা হয় পৃথিবীর প্রথম সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্ক। এর প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ড্রু ওয়েইনরিচকে বলা হয় সোশ্যাল মিডিয়ার জনক। তার তৈরি সোশ্যাল মিডিয়াটি আজও বিদ্যমান।
বর্তমানে সক্রিয় আছে যত সোশ্যাল মিডিয়া
পৃথিবীতে কয়েকশ সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্ক আছে। ব্লগভিত্তিক, ছবি ও ভিডিওভিত্তিক কিংবা চ্যাট বা বার্তাভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়া অহরহ। যার মধ্যে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম, টুইটারই সবচেয়ে জনপ্রিয়। চ্যাটভিত্তিক সোশ্যাল নেটওয়ার্ক যেমন টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ইত্যাদি। আবার ব্লগভিত্তিক বিভিন্ন সাইট আছে যেমন ফেসবুক, টাম্বলার, টুইটার (বর্তমানে ‘এক্স’ নামে পরিচিত) ইত্যাদি। ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, ইউটিউবও কম জনপ্রিয় নয়। বর্তমানে সবচেয়ে সক্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ৩০-এর অধিক।
সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সোশ্যাল মিডিয়া
ফেসবুক ব্যবহার করে না এমন মানুষ আমাদের আশপাশে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। পৃথিবীতে প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে; যা সব ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর মধ্যে সর্বোচ্চ। এর প্রায় সব ব্যবহারকারীই সক্রিয়। এর পরই রয়েছে ইউটিউব; প্রতি মাসে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২৫০ কোটির মতো। ৩ নম্বরে রয়েছে ফেসবুকেরই আরেকটি সাইট হোয়াটসঅ্যাপ, ব্যবহারকারী ২০০ কোটি।
ফোর্বসের তথ্যমতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সব সোশ্যাল মিডিয়ার মধ্যে ফেসবুক ভিজিট করে ৫৩ শতাংশ লোক। সারা বিশ্বে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা পৃথিবীর জনসংখ্যার ৩৭ শতাংশ। ২০০ মিলিয়নের বেশি ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা অনলাইনে পরিচালনার জন্য ফেসবুক ব্যবহার করেন। ৭ মিলিয়নের বেশি লোক ফেসবুকে ব্যবসার বিজ্ঞাপন দেন। শুধু ফেসবুক নয়, ব্যবসা পরিচালনায় মানুষ ফেসবুকেরই অন্য সোশ্যাল মিডিয়াগুলোও ব্যবহার করেন ব্যাপক হারে। এগুলোও ব্যবহারকারী তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। সবচেয়ে বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারীর লোক আছে অন্যতম জনবহুল দেশ ভারতে। ৩১৪.৬ মিলিয়ন লোক ভারতে ফেসবুক ব্যবহার করেন। দ্বিতীয় স্থানে ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতার দেশ যুক্তরাষ্ট্র। যেখানে ১৭৫ মিলিয়ন লোক ফেসবুকে সক্রিয়।
অঞ্চলভেদে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী
বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে প্রায় ৫০০ কোটি মানুষ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে থাকেন। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৭ সাল নাগাদ এ সংখ্যা বেড়ে হবে ৬০০ কোটি! মহাদেশ হিসেবে এশিয়া অঞ্চলের মানুষই এগিয়ে আছেন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে। এ অঞ্চলে প্রায় ২৯৪১.০১ মিলিয়ন লোক সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়। তার পরে আছে আমেরিকা মহাদেশ। দুই আমেরিকা মহাদেশের ৮১৯.২৯ মিলিয়ন লোক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। যার মধ্যে উত্তর আমেরিকায় ৪৪৭.৮২ ও দক্ষিণ আমেরিকায় ৩১৬.৭৮। তবে স্বতন্ত্রভাবে এ দুই মহাদেশ থেকে এগিয়ে ইউরোপ। ইউরোপের ৬৮১.৫৬ মিলিয়ন লোক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। সবচেয়ে কম সক্রিয় আফ্রিকা মহাদেশের মানুষ। এ মহাদেশের ৪২৭.০৫ মিলিয়ন লোক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন।
দেশের হিসাবে চীনের মানুষই সবচেয়ে বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। চীনের ১০২১.৯৬ মিলিয়ন লোক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে ভারত। দেশটিতে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭৫৫.৪৭ মিলিয়ন। তৃতীয় যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের দেশেও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা কম নয়, ২৪.৪৯ মিলিয়ন।
কারা বেশি সক্রিয়, নারী নাকি পুরুষ?
বিশ্বের প্রায় ৫৯ শতাংশ মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন; ৫৪ শতাংশ পুরুষ আর ৪৬ শতাংশ নারী। সংখ্যার হিসাবে পুরুষ ২.৬৪ আর নারী ২.২৫ বিলিয়ন। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সোশ্যাল মিডিয়া সাইট ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পুরুষ এগিয়ে। ৫৬.৬ শতাংশ পুরুষ আর ৪৩.৪ শতাংশ নারী ফেসবুক ব্যবহার করেন। নারীরা এগিয়ে আছেন স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহারে। ৫৩.৮ শতাংশ নারী এই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করেন।
বাংলাদেশেও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের দিক থেকে এগিয়ে পুরুষরা। প্রায় ৬৭.৪ শতাংশ পুরুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়। অন্যদিকে ৩২.৬ শতাংশ নারী সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থাকেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে অনেক এগিয়ে পুরুষ। প্রায় ৭৩ শতাংশ পুরুষ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন এ অঞ্চলে।
বয়সভেদে ব্যবহারকারী
সামাজিক মাধ্যমে বেশি সক্রিয় কম বয়সি তরুণ-যুবরা। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সির ৮৪ শতাংশই সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়। ৩০ থেকে ৪৯ বছর বয়সির মধ্যে যা ৮১ শতাংশ। আবার ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সি ৭৩ শতাংশ লোক সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় ব্যয় করেন। ৬৫ বছরের অধিক বয়সির মাত্র ৪৫ শতাংশ এ মাধ্যম ব্যবহার করেন। ফেসবুকের ক্ষেত্রেও তরুণদেরই অধিক সক্রিয় থাকতে দেখা যায়।
সোশ্যাল মিডিয়ার বৈশ্বিক বাজার
সোশ্যাল মিডিয়ায় যে শুধু মিলিয়ন মিলিয়ন ব্যবহারকারী বাড়ছে তা নয়; সাইটগুলোর নির্মাতারাও এর মাধ্যমে আয় করছেন কোটি কোটি ডলার। ২০২৩ সালে এসে সোশ্যাল মিডিয়ার বাজার দাঁড়িয়েছে ২৩১.১ বিলিয়ন ডলারে। সোশ্যাল মিডিয়াগুলো সাধারণত বিজ্ঞাপন এবং বিভিন্ন প্রকার সাবস্ক্রিপশন ফি থেকে আয় করে; যার বিনিময়ে সোশ্যাল মিডিয়াগুলো মাইক্রোব্লগ, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং, ছবি ও ভিডিও শেয়ারিং পরিষেবা দেয়।
ব্যবহারকারীর মতো আয়ের দিক থেকেও এগিয়ে ফেসবুক। ফেসবুকের মাতৃ কোম্পানি ‘মেটা’র সোশ্যাল মিডিয়াগুলোর আয় সর্বাধিক; যার মধ্যে ফেসবুকের আয় সর্বাধিক। ২০২২ সালে ফেসবুক ১১৬.৮ বিলিয়ন ডলার আয় করে। ফেসবুক অ্যাপ থেকেই এসেছে ৬৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২২ সালে ফেসবুকের মুনাফা ছিল ২৩.১ বিলিয়ন।
কত সময় ব্যয় হয় এ মাধ্যমে?
সোশ্যাল মিডিয়ায় যে মানুষ নতুন জগৎ গড়ে নিয়েছে তা এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা দেখলেই বোঝা যায়। প্রতি ১০ জন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর নয়জনই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। এ ছাড়া গড়ে প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টর বেশি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করেন মানুষ। অর্থাৎ পৃথিবীতে প্রতিদিন ১০ বিলিয়ন ঘণ্টা ব্যয় হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। ২.৯৬ বিলিয়ন মাসিক ব্যবহারকারীর দৈনিক ব্যবহারকারী ১.৯৬ বিলিয়ন। সবচেয়ে বেশি অ্যাকাউন্ট খোলা হয় ফেসবুকে। তাই সেখানে ভুয়া অ্যাকাউন্টের সংখ্যাও বেশি। ২০২২ সালে ফেসবুক ১.৬ বিলিয়ন ভুয়া অ্যাকাউন্ট সরিয়েছে তাদের সাইট থেকে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় কনটেন্ট হলো শর্ট ভিডিও। এক মিনিটের কম সময়ের এ ভিডিওগুলো মানুষের নজর কাড়ে বেশি। প্রায় ৬৬ শতাংশ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে শর্ট ভিডিও। মোবাইল থেকেই সবচেয়ে বেশি লোক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। বেশিরভাগ লোকই স্মার্টফোন বা ট্যাবলেটে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন।
শেষ কথা
প্রতিনিয়ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী বাড়ছে। ব্যবহারকারীরা শুধু সামাজিক যোগাযোগের জন্যই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন না। পরিবার এবং বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ছাড়াও খবর পড়া অন্যতম। ট্রেন্ডিংয়ে থাকা বা যে জিনিস নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা হয় তা নিয়ে মাতামাতি করাও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের অংশ। আবার বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ নিতেও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন অনেকে। তাই সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটি দিকই আছে।