মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:২২ পূর্বাহ্ন

অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের আরেকটি দল আসছে, নেতৃত্বে শিবিরের সাবেকরা

Reporter Name / ৬২ Time View
Update : সোমবার, ১৭ মার্চ, ২০২৫

প্রথম আলোর প্রতিবেদন।। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আত্মপ্রকাশের আগে ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছিলেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক দুই নেতা আলী আহসান জুনায়েদ ও রাফে সালমান রিফাত। সরকার পতনের এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের উদ্যোগে গঠিত এনসিপিতে তাঁরা ভালো পদ পাবেন বলে আলোচনা চলছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এই দলে থাকবেন না বলে জানান তাঁরা। এবার তাঁদের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ ঘটতে যাচ্ছে।

আগামী এপ্রিল মাসেই নতুন এই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ ঘটবে বলে আলী আহসান জুনায়েদ জানিয়েছেন। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া এই দুই নেতা বলছেন, গণ–অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার জায়গাটা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। সেটাকে বাঁচিয়ে রাখতেই তাঁদের নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে কাজ করবে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করাসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে মাঠে থাকবেন তাঁরা।

আলী আহসান জুনায়েদ ও রাফে সালমান রিফাত দুজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র। জুনায়েদ পড়েছেন উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগে। আর রিফাত পড়েছেন ফার্মেসিতে। তাঁরা দুজনই ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। যদিও জুলাই আন্দোলনের সময় এবং তাঁর আগের বছরগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কমিটি প্রকাশ্য ছিল না।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শক্তির নতুন প্ল্যাটফর্মের প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে আজ রোববার সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দিয়েছেন আলী আহসান জুনায়েদ। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘পিলখানা, শাপলা ও জুলাই গণহত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধের বিচার, ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা, দুর্নীতিমুক্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণ, ধর্মবিদ্বেষ ও ইসলামোফোবিয়ামুক্ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ গঠন, ফ্যাসিবাদী কাঠামোর সম্পূর্ণ বিলোপ এবং আধিপত্যবাদের বিপক্ষে কার্যকর অবস্থান—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আজ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গৌণ হয়ে পড়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের স্বীকৃতি ও সম্মান দেওয়ার কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে।’

এই পরিস্থিতিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের সব রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন জুনায়েদ। তিনি আরও লিখেছেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে বিপ্লবের সূচনা হয়েছে, তাকে পূর্ণতা দেওয়ার লক্ষ্যে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সমাজের সর্বস্তরে যোগ্য ও নৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, সামাজিক সুবিচার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা, সামাজিক নিরাপত্তা বিধান, বিদ্যমান ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার মূলোৎপাটন ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারলে এই বিপ্লব পরিপূর্ণতা পাবে। আমরা বিশ্বাস করি, নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে বাংলাদেশ পুনর্গঠন সম্ভব। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ পুনর্গঠনের এই উদ্যোগে সবাইকে সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানাই।’

এই পোস্টের সঙ্গে একটি পোস্টারের ছবি যুক্ত করেছেন জুনায়েদ। তাতে লেখা আছে, এই প্ল্যাটফর্মটি আসছে এপ্রিলে। এই পোস্টের মন্তব্যের ঘরে একটি গুগল ফর্মও যুক্ত করা হয়েছে। এই পোস্ট শেয়ার করে সমর্থন জানিয়েছেন রাফে সালমান রিফাত।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা তরুণদের উদ্যোগে গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠিত হয়। ২৬ নভেম্বর এই প্ল্যাটফর্মে কেন্দ্রীয় সদস্য হিসেবে যোগ দেন আলী আহসান জুনায়েদ ও রাফে সালমান রিফাত। এরপরই মূলত তাঁদের দুজনের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় সামনে আসে। জুলাই অভ্যুত্থানে তাঁদের ভূমিকার কথাও আলোচিত হয়।

এরপর ৯ ডিসেম্বর জাতীয় নাগরিক কমিটির সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন করা হয়। সেখানে জুনায়েদকে যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাফেকে যুগ্ম সদস্যসচিব করা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে নতুন দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলে দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক পদের জন্য জুনায়েদের নাম আলোচিত হয়। রাফে সালমান রিফাতও দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে পারেন, এমন আলোচনাও তখন ছিল।

কিন্তু একপর্যায়ে নতুন দলের শীর্ষ একটি পদে জুনায়েদকে বসানোর দাবিকে কেন্দ্র করে জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোক্তাদের ভেতরে বিতর্ক তৈরি হয়। এ নিয়ে ফেসবুকে পাল্টাপাল্টি পোস্ট দেন কমিটির দুটি পক্ষের সমর্থকেরা। আন্দোলনের কৃতিত্ব দাবি করে শুরু হয় কাদা–ছোড়াছুড়ি। এই বিতর্কে এক পক্ষে ছিলেন নাগরিক কমিটিতে থাকা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতারা, অন্য পক্ষে আখতার হোসেনের (বর্তমানে এনসিপির সদস্যসচিব) সমর্থকেরা।

এর মধ্যেই চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে বিএনপিসহ ৮টি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে ২৪ ফেব্রুয়ারি চীন সফরে যান আলী আহসান জুনায়েদ ও রাফে সালমান রিফাতসহ জাতীয় নাগরিক কমিটির চারজন নেতা। এ নিয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটিতে প্রশ্ন তৈরি হয়। সেদিন মধ্যরাতে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে নাগরিক কমিটি বলেছিল, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে তারা কোনো আমন্ত্রণ পায়নি। জুনায়েদ, রিফাতসহ চারজনের এই সফরের বিষয়ে জাতীয় নাগরিক কমিটি অবগত নয়। এমন পরিস্থিতিতে ২৫ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে ফেসবুকে পৃথক পোস্ট দিয়ে জুনায়েদ ও রিফাত জানান, তাঁরা নতুন রাজনৈতিক দলে থাকছেন না।

নতুন প্ল্যাটফর্ম কী করবে : জানতে চাইলে আলী আহসান জুনায়েদ আজ সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের নতুন প্ল্যাটফর্মটি একটি ‘পলিটিক্যাল প্রেশার গ্রুপ’ (রাজনৈতিকভাবে চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী) হিসেবে কাজ করবে। তাঁরা মনে করছেন, জুলাইয়ের স্পিরিট (আকাঙ্ক্ষা) দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। জুলাইয়ে যে অভূতপূর্ব ঐক্য তৈরি হয়েছিল, সেটাকে ধরে রাখতে নতুন প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছেন।

‘প্রেশার গ্রুপ’ পরিচয় দেওয়া আরও বেশ কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম গত কয়েক মাসে আত্মপ্রকাশ করে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে সক্রিয় আছে। নতুন করে ‘প্রেশার গ্রুপের’ প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করার কারণ কী, এই প্রশ্নে জুনায়েদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সবাইকে অ্যাকোমোডেট (অন্তর্ভুক্ত) করে কাজ করতে চাইছি।’


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা