শিরোনাম
সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:০৮ পূর্বাহ্ন

বিপ্লব ও সংহতি দিবসের বীরমাল্য কার?

Reporter Name / ১২২ Time View
Update : শুক্রবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক। দিনটি ‘বিপ্লব ও সংহতি’ দিবস নামেই সমধিক পরিচিত।

১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক ঐক্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাংলাদেশের নতুন পথচলা। বিগত সময়ের নানা টানাপড়েন ও সংকট পেরিয়ে নেতৃত্বে উঠে আসেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম রাষ্ট্রনায়ক,স্বাধীনতার ঘোষক ও মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে নেতৃত্বদানকারী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ নতুনভাবে নির্ধারিত হয়।

বিশেষত,১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশ যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও বিভাজনের চরম সীমায় উপনীত, তখন ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বরের ঘটনার মাধ্যমে জাতি একটি নতুন দিকনির্দেশনা লাভ করে। অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অস্থিতিশীল দেশে সিপাহি-জনতার ঐক্যের মাধ্যমে শুরু হয় রাষ্ট্রীয় পুনর্জাগরণ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদর্শন নতুনভাবে রূপ পায়, যেখানে জাতীয় ঐক্য, স্বনির্ভরতা, গণতন্ত্র, সামগ্রিক উন্নয়ন এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি ছিল মূল ভিত্তি।

জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর একটি নতুন বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে অগ্রসর হন। অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক ন্যায়ের মাধ্যমে তিনি দেশকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করতে চেয়েছিলেন। সেই ভাবনা থেকেই জিয়াউর রহমান ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’ গঠনের লক্ষ্যে কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, প্রশাসন ও রাজনীতিতে মৌলিক সংস্কার শুরু করেন। বলতে গেলে, জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই প্রথম বাংলাদেশ উন্নয়নের দিকে ধাবিত হয়। রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে জন-অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তিনি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এর মাধ্যমে তিনি জাতীয় ঐক্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি প্রশাসনিক কাঠামোতে দক্ষতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ জোর দেন। বেসামরিক প্রশাসন ও জনপ্রশাসনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এবং দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৭৮ সালে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনর্বহাল করেন, যা রাজনৈতিক বহুমাত্রিকতা ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির ভিত্তি তৈরি করে। এ ছাড়া তিনি কৃষি ও শিল্পে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণে পদক্ষেপ নেন। এতে বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীলতা লাভ করে, যা বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

রাষ্ট্রগঠনে জিয়াউর রহমানের দূরদর্শিতার অন্যতম পরিচায়ক হলো, তার ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি। এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশকে তথাকথিত ‘তলাবিহীন’ ঝুড়ি থেকে অন্যতম স্বনির্ভর দেশ হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল এই ১৯ দফার। এই কর্মসূচির মাধ্যমেই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক,সামাজিক ও পররাষ্ট্রনীতি পুনর্গঠনের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দফাগুলো ছিল কৃষিবিপ্লবের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগণের স্বনির্ভরতা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা, যেন তা দেশের অগ্রগতিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নারী ও যুব সমাজকে জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা, স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে দেশকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি। জিয়াউর রহমান তার উনিশ দফার মধ্যে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন দর্শনের যে রূপরেখা প্রদান করেন, তা পরবর্তী সময় দেশের বিভিন্ন সরকার ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিশ্ব আজ নানা সংকটের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, বৈষম্য, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা সংকটসহ আরও বহু চ্যালেঞ্জ গোটা বিশ্বকে জর্জরিত করে রেখেছে। এসব সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত বৈশ্বিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেই জাতিসংঘ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়, ২০১৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময়কে লক্ষ্য রেখে গৃহীত হয় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)। এই এসডিজির আওতায় মানবকল্যাণ ও পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশ্যে ১৭টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, জাতিসংঘের এই টেকসই উন্নয়ন চিন্তাধারার বহু আগেই অর্থাৎ ৩৮ বছর আগেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরতার জন্য ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। তার এই ঘোষণায় ছিল গ্রামীণ অর্থনীতি পুনর্গঠন, কৃষি ও শিল্পোন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। নিঃসন্দেহে জিয়াউর রহমানের এই ১৯ দফাই ছিল বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের প্রাথমিক রূপরেখা। এমন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও বাস্তবমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনার ফলেই জিয়াউর রহমান পরিণত হন একজন সফল রাষ্ট্রনায়কে। বিশেষ করে, ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পর দেশের যে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল, তা থেকে উত্তরণের পথে এই ১৯ দফা ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। যুগের পর যুগ ধরে তার রাষ্ট্রদর্শন ও উন্নয়নচিন্তা এখনও বাংলাদেশের মানুষের কাছে অনুকরণীয় ও প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে। তার উন্নয়ন।

বিপ্লব ও সংহতি দিবসের বীরমাল্য কার?

বীর কে? বীরত্ব কোন কোন উপাদান নিয়ে গঠিত হয়, যার কারণে তাকে লোকে বীর বলে? এটা নিয়ে ক্রিস্টোফার কডওয়েল একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন। আহমদ ছফার দুর্দান্ত অনুবাদ পড়েছিলাম নষ্ট যৌবনে। ক্রিস্টোফার কডওয়েলকে বলা হয় এ যুগের অ্যারিস্টটল। তিনি ১৯৩৭ সালে স্পেনের ফ্যাসিস্টবিরোধী লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের সৈনিক হিসেবে যোগ দিয়ে শহীদ হন।

বীরত্ব কি ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব? না। কারণ সহজ ও বৈশিষ্ট্যহীন ব্যক্তিত্বের অধিকারী মানুষরাও বীরে পরিণত হয়েছেন। তাহলে কি সাহস বলব? সাহসের বলে মানুষ জানের ঝুঁকি নিয়ে মরণের বেশি কিছু করতে পারে না। মহাযুদ্ধগুলোয় এ রকম সাহস নিয়ে লাখো মানুষ মরেছে। সাফল্য কি বীরত্ব? যদি হয়, তাহলে রকফেলার, বিল গেটস তাহলে বীর। কিন্তু লোকে কি তা বলে? বলে না তো। তাহলে দক্ষতা? সেটা তো মুচি বা স্বর্ণকারেরও আছে। তাকে তো বীর বলি না। তাহলে বীরের প্রধান গুণ কী?

আচ্ছা, বাগ্মিতা কি বীরের গুণ হতে পারে? যিনি কথা দিয়ে মানুষকে জাগিয়ে তোলেন। কথার জোরেই একটি জাতি লড়াইয়ে নেমে পড়ে? ক্রিস্টোফার কডওয়েল বলেছেন, হ্যাঁ, বাগ্মিতা আধেক গুণ। পুরোটা এ কারণে নয়, তখন হিটলারকে বীর বলতে হয়। হিটলারের বক্তৃতায় মানুষ জেগে উঠেছে এবং অন্ধকারের গর্তে আত্মাহুতি দিয়েছে। কডওয়েলের ভাষায়, একই সময়ে যেমন আসেন বীর তপমনি বেশে প্রতারক বাক্যবাগীশ। বাইরে থেকে দেখতে দুজনে একইরকম। দুজনের আবির্ভাবের কারণও এক অথচ তারা বিপরীতমুখী। একজন আসে লেনিন ও মাও বেশে, আরেকজন আসে হিটলার ও মুসোলিনী বেশে। পরিহাস হচ্ছে, সব বাক্যবাগীশকে পহেলা মনে হবে মুক্তির দেবতা আর বীরকে মনে হবে ধ্বংসকারী বলে। কারণ বাক্যবাগীশ মানবশক্তির অপচয় করে মিষ্টি কথায় সমাজকে পেছনে নিয়ে যেতে চাইবে আর বীর পুরনো প্রেক্ষাপট ভেঙে তৈরি করেন নতুন মানচিত্র।

তার ভাষায় বীর হলেন ভøাদিমির ইলিচ লেনিন। কারণ তিনি জাতিকে জাগিয়েছেন এবং জেগে ওঠার পর আরও উন্নততর জীবনের দিশা দিয়েছেন। তার ভাষায়, তাই এ যুগের মানুষরা যারা হবেন বীর, তাদের সাবালক হওয়া চাই। পরে চীনের নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব দেখার পর ক্রিস্টোফার কডওয়েল বলেন, এ যুগে বীর হলেন সংগঠিত জনগণ।

দুই : ৫-৮ আগস্ট, ২০২৪ ক্ষমতায় কেউ ছিল না আসলে। কিন্তু ক্ষমতা রাস্তায় গড়াগড়ি করেছে ’৭৫-র ৩-৭ নভেম্বরে। একদিকে মোশতাক গং, আরেকদিকে মুক্তিযুদ্ধের ‘কে ফোর্স’-এর অধিনায়ক খালেদ মোশাররফ বীর-উত্তম এবং আরেকদিকে কর্নেল আবু তাহের বীর-উত্তমের নেতৃত্বাধীন সিপাহি-জনতা। মুখোমুখি ত্রিপক্ষীয় দ্বন্দ্বের ফলাফল এক বীর-উত্তমের দেশত্যাগ আর দুই বীর-উত্তমের মৃত্যু।

সাত নভেম্বর কথা ছিল ক্যান্টনমেন্ট থেকে কর্নেল তাহের বন্দি ‘জেড ফোর্স’-এর অধিনায়ক জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করে শহীদ মিনারে নিয়ে আসবেন। আর শিল্পাঞ্চল ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিরাজুল আলম খানরা শ্রমিক ও ছাত্রদের নিয়ে আসবেন। সবার মোহনা শহীদ মিনার। কিন্তু তা হলো না। সিরাজুল আলম খানরা সেদিন শহীদ মিনারে জমায়েত করতে ব্যর্থ হলেন। অন্যদিকে জিয়াউর রহমানকে কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহিরা মুক্ত করলেন কিন্তু জনতার সঙ্গে মিলতে পারলেন না। ইতিহাস শুধু ব্যর্থতা দিয়েই নির্মিত হয় না, হয় আকাক্সক্ষা দিয়েও। কর্নেল তাহের তার জাতিকে আরও উন্নত জীবনের জন্য ডাক দিয়ে গেছেন। বীরের বৈশিষ্ট্য তার গলাতেই মানায়।

সব ঝড় শেষে ইতিহাসের খাল ফুঁড়ে বের হয়ে এলেন মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক জিয়াউর রহমান। বের হয়ে এলো বাংলাদেশ। কমিউনিস্ট তাহেরের বিপ্লবী মুহূর্ত (বিশেষ প্রথম পৃষ্ঠার পর)

থেকে বাংলাদেশ প্রথাগত পথে ফিরল জিয়াউর রহমান বীর-উত্তমের হাত ধরে। ক্যান্টনমেন্টে শৃঙ্খলা ফেরালেন। একদিকে বিদেশি চক্রান্ত, আরেকদিকে বিপ্লবী প্রচেষ্টাÑ দুই পক্ষের হাত থেকে মধ্যপন্থায় ফেরালেন তিনি।

জিয়াউর রহমান এমন ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যার জনপ্রিয়তা সৈনিক ও অফিসারÑ দুই পক্ষের মধ্যেই ছিল। ফলে তিনি সেনাবাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা ফেরাতে পেরেছিলেন। তিনি যেমন ’৭৫-র খুনিদের কেউ ছিলেন না, ছিলেন না খালেদ মোশাররফের, তেমনি বিপ্লবী তাহেরও ছিলেন না। আবার ছিলেন সবারই আস্থার। তিনি বাংলাদেশকে শৃঙ্খলায় ফেরাতে চেয়েছেন।

তিন : কর্নেল তাহেরের প্রস্তাব ছিল, বাকশালভুক্ত পার্টিগুলোকে নিষিদ্ধ করে বাকিগুলোর জন্য রাজনীতি উন্মুক্ত করে দেওয়া। কিন্তু জিয়াউর রহমান তা না করে সবার জন্য তা করলেন। ফলে মোহাম্মদ তোয়াহার মতো গোপন রাজনীতিকরা প্রকাশ্যে এলেন, সংসদে এলেন। তেমনি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী ও বাকশালীরাও যেমন রাজনীতিতে সুযোগ পেল, সুযোগ পেল স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামও। তার খাল কাটা কর্মসূচিতে সমর্থন জানাল বাকশালভুক্ত দল সিপিবিও। কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলেন, লীগের জনক দুজন। একজন মওলানা ভাসানী, আরেকজন জিয়াউর রহমান। কারণ শেখসাব নিজেই আওয়ামী লীগকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছিলেন।

ক্রিস্টোফার কডওয়েল, যাকে বীর কল্পনা করে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন, সেই টি.ই. লরেন্সও বুর্জোয়া মালিকানার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। তিনিও সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। সেনাবাহিনীকেও বুর্জোয়া মালিকানার অংশ মনে করতেন। শ্রমিক রাজত্ব কায়েমের অতৃপ্ত বাসনা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত, ঠিক আমাদের কর্নেল আবু তাহেরের মতো। কর্নেল আবু তাহের মানুষের চেতনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন, কিন্তু জিয়া ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। বলা হয়, শুধু মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারের নিরিখে বীরপুরুষ যাচাই হয় না, বহির্বাস্তব নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দিয়ে যাচাই করতে হয় বীরপুরুষকে।

কেউ বলতে চান, সাগরের ঢেউয়ে ভেসে সৌভাগ্যের চূড়ায় চড়েছেন জিয়া। তিনি তা নন। যে ঘটনাবলি বীর তৈরি করে, তাতে তার কিছু থাকা চাই। জিয়া ছাড়া কার এত জনপ্রিয়তা ছিল, যিনি সৈনিক ও অফিসারদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারতেন? জিয়া এদের সবার হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছেন। এমনকি তিনি তলাবিহীন ঝুড়ির ফুটো সেলাই করার মিস্ত্রিও। কৃষি, গার্মেন্ট ও জনশক্তি রপ্তানিসহ আর্থিক খাত সংহত করলেন। জাতীয় সংহতি শুধু সামরিক বাহিনীর ব্যাপার নয়, ক্ষুধা-দারিদ্র্য থেকে রক্ষাও সংহতির অংশ। অবশ্য কর্নেল তাহেরও লাঙল ব্রিগেড করেছিলেন, উৎপাদনশীল সেনাবাহিনী তারই আইডিয়া। অর্থাৎ দেশকে নিয়ম ও শৃঙ্খলার সঙ্গে চালিত হতে হয়। এমনভাবে চালিত হতে হয়, যাতে বীরের আর দরকার না হয়। দেশ বিপদে পড়লেই বীরদের দরকার হয়। দেশকে এমনভাবে চালিত হতে হবে, সেই বিপদ যাতে দেশের না আসে। তাহের ও জিয়া দুজনেই বীর ছিলেন, ছিলেন সৈনিক, যিনি সাহস ও শৃঙ্খলার প্রতীক। দুজনেই সংগঠিত জনগণের প্রতীক।

বাক্যবাগীশরা যা তৈরি করতে চায়, কালের স্রোত সব ধুয়ে নিয়ে যায়। অন্যদিকে কাজ শেষ করার আগে বীরের মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু তার শিক্ষা বেঁচে থাকে। যে লক্ষ্যের জন্য তিনি সংগ্রাম করেছেন, তাই তাকে স্থায়িত্ব দেয়। ভবিষ্যৎ ছাড়া বর্তমান কি কোনো কিছুকে স্থায়িত্ব দিতে পারে?

গ্যালিলিওর শাস্তি ঘোষণার পর তার শিষ্য আফসোস করে বলছেন : দুর্ভাগা সেই দেশ, যে দেশ তার গুণীর মূল্য দেয় না। শিষ্যকে থামিয়ে দিয়ে তখন গ্যালিলিও বলেন, না, না, দুর্ভাগা সেই দেশ, যে দেশে গুণীর দরকার হয়।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা