শিরোনাম
সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬, ০৮:৫৭ পূর্বাহ্ন

ভোটের ট্রেন ছাড়ছে আজ

Reporter Name / ৩৫ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা হচ্ছে আজ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন সন্ধ্যা ৬টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণে এ তফসিল ঘোষণা করবেন। তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়েই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী যাত্রায় প্রবেশ করবে। প্রথা অনুযায়ী, তফসিলের পর থেকে ভোটগ্রহণের দিন পর্যন্ত ৬০ দিনের সময় থাকে। সে হিসাবে ৮ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভোট হতে পারে।

এদিকে ভোট আয়োজনে ইসি ইতিমধ্যে সব প্রস্তুতি শেষের কথা বললেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সুষ্ঠু ভোটের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সামনে। তারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমান অবস্থার চেয়ে উন্নত না হলে ইসির সব আয়োজনই ঝুঁকির মুখে পড়বে।

তফসিলের বিষয়ে গতকাল বুধবার ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় সংসদ ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা করা হবে। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের রেকর্ড করা ভাষণ প্রচারের মাধ্যমে তফসিল ঘোষণা করা হবে।

রেওয়াজ অনুযায়ী তফসিলের আগে বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ইতিমধ্যে রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা ও বিচারপতিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে তাদের অবহিত করেন তিনি। এ ছাড়া সিইসির তফসিল ঘোষণার ভাষণটিও গতকাল রেকর্ড করা হয়েছে। তফসিলের মধ্যে নির্বাচনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা হয়।

সংবিধান এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন ভোটের দিন-তারিখ, মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই, প্রত্যাহার, প্রচারণা এবং ভোটগ্রহণের সম্পূর্ণ সময়সীমা নির্ধারণ করে। অর্থাৎ, তফসিল ঘোষণার মাধ্যমেই দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে যায়। তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আইনগতভাবে পুরো প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের অধীনে চলে আসে। তবে ইসি চাইলে নির্বাচনের তারিখ বদলাতে পারে। সে ক্ষেত্রে তফসিল সংশোধন করে নতুন তফসিল দিতে পারে।

ইসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত দল ৩৯টি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল হিসেবে অংশ নিতে পারছে না তারা। অন্যদিকে জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলের নিবন্ধনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। শেষ পর্যন্ত এসব দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কি না, তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।

ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, যেসব দলের নিবন্ধন রয়েছে, তাদের ভোটে অংশ নিতে কোনো বাধা নেই।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন মাসের মাথায় নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নেয় নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশন। দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাস পর থেকেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করে তারা। গত ২৮ আগস্ট ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয় ইসির পক্ষ থেকে।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রশাসনিক অস্থিরতা ও পুলিশ ব্যবস্থার ভেঙে পড়া এখনো পুরোপুরি কাটেনি। অনেক এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ দেখা যাচ্ছে। নির্বাচন বানচালের জন্য ভেতরে ও বাইরে থেকে অনেক শক্তি কাজ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ হুমকি দিয়ে বলেছে, আগামী নির্বাচনে তাদের অংশ নিতে না দিলে দলটির লাখ লাখ সমর্থক এ নির্বাচন বয়কট করবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ইতিমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তাদের কয়েকটি আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে ইসিকে অবহিত করেছে। রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এখনো তৈরি হয়নি। দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিপক্ষের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া অবৈধ অস্ত্র এখনো পুরোপুরি উদ্ধার করা হয়নি। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মামলায় জামিনে বেরিয়ে আসা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) নামে একটি মানবাধিকার সংগঠন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে সারা দেশে ৯৬টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১২ জন নিহত এবং অন্তত ৮৭৪ জন আহত হয়েছেন। এটি গত চার মাসের মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতায় সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, সমাবেশকেন্দ্রিক সহিংসতা, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা নিয়ে অন্তর্কোন্দল, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এসব সহিংসতা ঘটেছে।

এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলেও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জই এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাসউদ বলেছেন, তফসিল ঘোষণার আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ইসির দায়িত্ব নয়। তফসিল ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিকভাবে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির দায়িত্ব আসবে।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সব ধরনের বেআইনি ও অনুমোদনহীন জনসমাবেশ এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী আন্দোলন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, তফসিল ঘোষণার পর কেউ দাবি-দাওয়া নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি বা নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও উৎসবমুখর করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে সরকার। তফসিল ঘোষণার পর সশস্ত্র বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনী এ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে। তারা যদি মারামারি বন্ধ না করে, অশুভ প্রতিযোগিতা বন্ধ না করে, তাহলে সরকার বা নির্বাচন কমিশন যতই চেষ্টা করুক, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না।

তিনি বলেন, কেউ কেউ চায় নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা হোক, তাদের স্বার্থ আছে। এখন বলটা তাদের কোর্টেই। প্রথমে নিজের দলের ভেতর শৃঙ্খলা আনতে হবে। দল যদি নিজে শৃঙ্খলা বজায় রাখে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার কোনো কারণ থাকবে না।

নির্বাচন বিশ্লেষক মুনিরা খান বলেন, নির্বাচন বানচাল করতে নানা ষড়যন্ত্র হতে পারে। নিরাপদ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। একা ইসির পক্ষে সফল নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। নির্বাচনের চার প্রধান স্টেকহোল্ডার ভোটার, সরকার, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দল সবাইকে দায়িত্বশীলভাবে এগিয়ে আসতে হবে। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে প্রত্যেকের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন অত্যন্ত জরুরি।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মো. আব্দুল আলীম বলেন, ১৯৯১, ১৯৯৬ বা ২০০১ সালের নির্বাচনের পরিবেশের সঙ্গে বর্তমান পরিবেশের তুলনা করলে নিঃসন্দেহে বলা যায়, আমরা এখন সেই অবস্থায় নেই। এটা স্বীকার করতেই হবে। তবে তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলো স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনে পুরোপুরি মনোযোগ দেবে। ফলে বর্তমান উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তাও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অতিরিক্ত সতর্কতা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তাই পরিবেশ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট রয়েছে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের সঙ্গে ঝুঁকি থাকবেই। এবার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। কিন্তু নির্বাচন ছাড়া আমাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই। নির্বাচন নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে তার পরিবর্তে কী হবে, তার উত্তর কারও জানা নেই। সুতরাং, করণীয় হলো তফসিল ঘোষণার পর সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পূর্ণ মনোযোগ নির্বাচনের দিকে নিবদ্ধ করা। এতে বর্তমান পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা