শিরোনাম
শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৪৭ পূর্বাহ্ন

সংসদে প্রথম অধিবেশনে যেভাবে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হবে

Reporter Name / ৭ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
ছবি - সংগৃহীত

আগামী ১২ মার্চ সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি। তবে আগের সংসদের স্পিকার পদত্যাগ করায় এবং ডেপুটি স্পিকার কারাগারে থাকায় প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব কে করবেন—তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের মধ্য দিয়ে কার্যকর হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। আগামী ১২ মার্চ সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি। তবে আগের সংসদের স্পিকার পদত্যাগ করায় এবং ডেপুটি স্পিকার কারাগারে থাকায় প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব কে করবেন—তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পরই বিএনপি জোট তারেক রহমানকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করেছে।

অন্যদিকে, সংসদীয় টিমের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামী–এনসিপি জোট জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানকে বিরোধীদলীয় নেতা এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নির্বাচিত করেছেন।

সংবিধান অনুযায়ী, সরকারি ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, আগামী ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। সেই অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন। একই অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার কথা।

তবে বিগত সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অবর্তমানে সংসদের অধিবেশন কীভাবে শুরু হবে বা প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন—তা নিয়েও নানা আলোচনা দেখা যাচ্ছে।

সংসদ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বর্তমানে বিগত সংসদের স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তিকে দিয়ে অধিবেশন শুরু করাতে হবে।

সংসদ অধিবেশন শুরু হবে কীভাবে?

গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করার পর এরই মধ্যে সরকার গঠন করেছে বিএনপি।

নির্বাচনের পরদিন, অর্থাৎ ১৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নামে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে।

বিএনপি সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আইনে বেঁধে দেওয়া সময়ের দুই দিন আগেই ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। সোমবার রাষ্ট্রপতি এই সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন।

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। আর ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন শামসুল হক টুকু।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর স্পিকারের পদত্যাগ এবং ডেপুটি স্পিকারের কারাবন্দি অবস্থার প্রেক্ষাপটে সংসদের প্রথম অধিবেশন কীভাবে পরিচালিত হবে—সেটি নিয়েও নানা প্রশ্ন সামনে আসছে।

সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পর্কে বলা আছে, ‘কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ-সদস্যদের মধ্য হইতে সংসদ একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করিবেন, এবং এই দুই পদের যে কোনোটি শূন্য হইলে সাত দিনের মধ্যে কিংবা ওই সময়ে সংসদ বৈঠকরত না থাকিলে পরবর্তী প্রথম বৈঠকে তাহা পূর্ণ করিবার জন্য সংসদ-সদস্যদের মধ্য হইতে একজনকে নির্বাচিত করিবেন।’

সংবিধানে আরও বলা হয়েছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য হলে ডেপুটি স্পিকার দায়িত্ব পালন করবেন; তার পদও শূন্য হলে বা কোনো কারণে তারা দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য এ দায়িত্ব পালন করবেন।

তবে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, প্রথম অধিবেশন পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনীত করতে পারেন।

আবার সংবিধানের একটি বিধানে উল্লেখ আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য হলেও পরবর্তী উত্তরাধিকারী দায়িত্বভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাঁরা স্বীয় পদে বহাল আছেন বলে গণ্য হবেন।

সংসদ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিগত সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার—দুজনই অনুপস্থিত। সে কারণে সংসদ অধিবেশন ডাকার পর কী হবে, তা নিয়ে একটি সংকট তৈরি হয়েছে। কেননা এটি ব্যতিক্রমী একটি ঘটনা।’

তার মতে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার—দুজনের একজনও যদি উপস্থিত না থাকেন, তাহলে কার্যপ্রণালী বিধির (৫) ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি অধিবেশন পরিচালনা করতে পারেন।

তিনি বলেন, ‘এটি অনুসরণ করা হলে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে মনোনয়ন আসতে হবে। এক্ষেত্রে হয়তো রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে বলবেন, সেভাবেই হবে।’

শুরুতেই স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান।

বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ অন্যান্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেন। একই দিন বিকেলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, আগামী মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে। ওই অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন।

গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংবিধান ও কার্যপ্রণালিতে সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।

অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘বিগত সংসদের স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তির সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু করতে হবে। এরপর ওই অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে।’

সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করতে হবে।

নিয়ম অনুযায়ী, কোনো একজন সংসদ সদস্য স্পিকার পদে কারও নাম প্রস্তাব করে সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে নোটিশ দেবেন। অন্য একজন সংসদ সদস্যকে সেই প্রস্তাবে সমর্থন জানাতে হবে। যাঁর নাম প্রস্তাব করা হবে, তিনি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনে সম্মত—এমন লিখিত বিবৃতিও নোটিশের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে।

এরপর প্রস্তাবটি সংসদ সদস্যদের ভোটাভুটিতে যাবে।

অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন বলেন, ‘যদি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে একাধিক প্রার্থী না থাকেন, তাহলে কণ্ঠভোটের মাধ্যমেই তাদের নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে।’

সাধারণত স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তার সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হলে অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হবে। এরপর রাষ্ট্রপতি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন। তারা শপথ নেওয়ার পর তাদের সভাপতিত্বে পরবর্তী সংসদীয় কার্যক্রম শুরু হবে।

বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত বা পদ শূন্য না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের পদে বহাল থাকবেন। নতুন সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংসদ গঠন না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা আগের পদেই দায়িত্ব পালন করবেন।

নতুন সংসদের অধিবেশন শুরু হলে এবং নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার শপথ গ্রহণ করলে পূর্ববর্তী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের কার্যকালের অবসান ঘটবে।

বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার—দুই পদই সাধারণত সরকারি দল থেকে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। তবে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার সংক্রান্ত ‘জুলাই সনদ’-এ বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

সরকার ও বিরোধী দলীয় হুইপের কাজ কী?

জাতীয় সংসদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর মধ্যে অন্যতম সরকারি ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ এবং হুইপের পদ। সংসদীয় কার্যক্রম সচল রাখা, দলীয় অবস্থান সমন্বয় করা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এই পদগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চিফ হুইপকে সংসদে সরকারি দলের মুখপাত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চিফ হুইপের সঙ্গে একাধিক হুইপ থাকেন, যারা সবাই সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেই নির্বাচিত হন। চিফ হুইপ ও হুইপদের প্রধান দায়িত্ব হলো সংসদে দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং দলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সমন্বয় করা।

সংসদ বিষয়ক গবেষকদের মতে, হুইপের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে নিজ দলের সদস্যদের নিয়মিত সংসদে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, সংসদে কোনো বিল উত্থাপিত হলে দলীয় সদস্যরা যেন দলের পক্ষে ভোট দেন তা নিশ্চিত করা এবং সদস্যরা কোন বিষয়ের ওপর কতক্ষণ বক্তব্য দেবেন তার সময়সীমা নির্ধারণ করা। সংসদীয় কৌশল নির্ধারণ ও ভোট ব্যবস্থাপনায়ও তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যরা ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণ করেন। শপথের দিনই সরকারি দল মন্ত্রিসভা গঠন করে। একই দিনে সংসদে জামায়াত-এনসিপি জোটের সদস্যরাও শপথবাক্য পাঠ করেন।

পরে বিরোধী জোটের বৈঠকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর আমির শফিকুর রহমানকে বিরোধী দলীয় নেতা, জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে বিরোধী দলীয় উপনেতা এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নির্বাচিত করা হয়।

অধ্যাপক মহিউদ্দিন বলেন, আইন অনুযায়ী চিফ হুইপ এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার পদ একজন পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদার। ফলে বিরোধীদলীয় নেতা একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করা হলেও সংসদ উপনেতা কিংবা সরকার দলীয় চিফ হুইপের পদ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা