• শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:০১ অপরাহ্ন

জিয়া হত্যা/সেনানিবাসে নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলি করে হত্যা করা হয় জেনারেল মঞ্জুরকে

Reporter Name / ২৫ Time View
Update : শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

১৯৮১ সালের ৩০ মে, সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্যের হাতে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান নিহত হন। বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কাহিনি তখন পর্যন্ত ছিল গোপনীয়তার আবরণে ঢাকা। বিভিন্ন সূত্র থেকে সংগৃহীত জানা-অজানা বহু তথ্যের সমাবেশে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সাউথ এশিয়ান মনিটরের সম্পাদক ও অধুনালুপ্ত প্রোব নিউজের প্রধান সম্পাদক ইরতিজা নাসিম আলী। ১৯৯৪ সালের ৩০ মে থেকে প্রতিবেদনটি আট পর্বে ধারাবাহিক ছাপা হয়েছিল মতিউর রহমান সম্পাদিত তৎকালীন দৈনিক ভোরের কাগজে। লেখকের অনুমতি নিয়ে আজকের পত্রিকার পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি আবার প্রকাশ করা হলো। আজ সপ্তম কিস্তি।

এগিয়ে যাচ্ছিল জেনারেল মঞ্জুরের কনভয়টা। সামনের দিকে থেকে গোলাগুলির শব্দ আসতেই ব্রেক করল গাড়িগুলো। জেনারেল তাকালেন মেজর রেজার দিকে। বুঝতে অসুবিধা হলো না কি বলতে চান তিনি। গাড়ি থেকে নেমে সোজা উঠে গেলেন মেজর রেজা একটা টিলার ওপরে। যেদিক থেকে গুলির শব্দ আসছে সেদিকে তাকিয়ে অবস্থা দেখলেন রাস্তার ওপর কারা জানি দৌড়াদৌড়ি করছে। ‘স্যার আমাদের বোধ হয় সামনে আর এগিয়ে যাওয়া উচিত হবে না’— নিচে নেমে রেজা জানালেন জেনারেলকে।

জেনারেল মঞ্জুর বুঝে গেলেন সামনে আর এগোনো যাবে না। গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে বললেন সবাইকে। ঘুরে গেল গাড়িগুলোর মুখ। কিন্তু স্টার্ট নিল না জেনারেলের জিপটা। কিছুক্ষণ বৃথা চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিলেন তিনি। আর দুটো গাড়িতে ভাগাভাগি করে উঠে বসলেন সবাই। পিকআপ আর জিপটা এগিয়ে চলল চট্টগ্রামের দিকে।

অনেকক্ষণ উপুড় হয়ে পড়েছিলেন মেজর মোজাফফর। ঝোপের আড়াল থেকে দেখছেন কর্নেল মতি আর মাহবুব একে অপরকে গুলি করে মৃত্যুবরণ করেছেন। বুঝলেন এখানে আর বেশিক্ষণ থাকা উচিত হবে না। ঝোপের আড়ালে আড়ালে ক্রুশ করতে শুরু করলেন। এগিয়ে গেলেন অনেক দূর। পিঠে দুটো গুলি নিয়ে অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে ক্রুশ করতে তবুও ‘বাঁচতে হবে’ এ কথা ভেবে এগিয়ে যেতে থাকলেন। এরপর একুশটা দিন মেজর মোজাফফর আশ্রয় নিয়েছিলেন অপরিচিত এক উপজাতির বাসায়। বেশ কয়েক দিন প্রচণ্ড জ্বরে বেহুঁশ হয়েছিলেন। ঢাকা বেতার থেকে তখন জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দিতে পারলে আড়াই লাখ টাকার ঘোষণা চলছে তাঁর নামে। খবরের কাগজেও ছবি ছাপা হচ্ছে তাঁর। বুঝলেন মোজাফফর একটু কৌশলের আশ্রয় নিতে হবে। ঢাকায় সম্পূর্ণ অপরিচিত এক উপজাতীয় ছেলেকে দিয়ে চিঠি পাঠালেন সেনা দপ্তরে। চিঠিতে লেখা ছিল ‘রেডিওতে ঘোষণা বন্ধ না হলে তিনি আত্মসমর্পণ করতে পারছেন না। কারণ আড়াই লাখ টাকার লোভে রাস্তাঘাটে যে কেউ খুন করতে পারে তাঁকে।’ ভাগ্যক্রমে সেই উপজাতীয় ছেলেটি চিঠিটা পৌঁছালে রেডিওর ঘোষণা বন্ধ হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ অঞ্চলের পথঘাট চেনা ছিল মেজর মোজাফফরের। আর অপেক্ষা না করে সীমান্ত পেরিয়ে ত্রিপুরার সাবরুম এলাকা দিয়ে চলে যান ভারতের আগরতলায়।

চট্টগ্রামের দিকে এগিয়ে চলেছে জেনারেল মঞ্জুরের জিপ আর পিকআপটা। হাত তুললেন জেনারেল। থেমে গেল গাড়ি দুটো। ‘গাড়ি এখানে ছেড়ে দিয়ে আমাদের হাটতে হবে’—বললেন জেনারেল। আহত অফিসার ফজলে হোসেন আর জামিলকে স্ট্রেচারে বহন করার নির্দেশ দিলেন তিনি।

স্ট্রেচারে শোয়া অবস্থাতেই ফজলে হোসেন বলে উঠলেন, ‘‘অসম্ভব, আমাদের বহন করতে গিয়ে আপনারা ধরা পড়তে পারেন না।’ জেনারেল কিছু একটা বলতে গেলেন কিন্তু তার আগেই বলে উঠলেন কর্নেল ফজলে হোসেন, ‘স্যার আমার পরিচিত একটা কাঠের দোকান রয়েছে সামনে। অনেক কাঠ কিনেছি ওখান থেকে। আমাকে ওরা চেনে। আমাদের কোনো অসুবিধা হবে না। আমাদের জন্য প্লিজ আপনাদের বিপদ ডেকে আনবেন না।’ চোখ দুটো ভিজে গেল মিসেস মঞ্জুরের, বললেন, ‘ফজলে ভাই, আপনাদের ফেলে আমরা যাব না।’

‘ভাবি চলে যান’—প্রায় ককিয়ে উঠলেন কর্নেল ফজলে হোসেন। এগিয়ে এলেন জেনারেল, আহত দুজনের হাতে হাত রেখে মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে বিদায় জানালেন। কথা হলো মেজর খালেদ আর মেজর ইয়াজদানী গাড়ি এবং ওদের রেখে জেনারেলের সঙ্গে যোগ দেবেন পাশের গ্রামে। হুঁশ করে বেরিয়ে গেল গাড়ি দুটো কর্নেল ফজলে হোসেন আর ক্যাপ্টেন জামিলকে নিয়ে।

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলেন জেনারেল। কিন্তু ফিরে এল না খালেদ আর ইয়াজদানী। সবাই বসে ঠিক করে ফেললেন আর অপেক্ষা না করে রওনা হতে হবে হায়াকোয়ার পথে। গাইড ঠিক করা হলো পথ চিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। পর পর গাইড বদল করা হলো পথে। তৃতীয় গাইডটা ওঁদের নিয়ে গেল একটা চা বাগানে।

অবুঝ শিশু দুটো কাঁদতে শুরু করেছে ক্ষিধের জ্বালায়। সবাই ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর। কিন্তু কিছুতেই কান্না থামানো যাচ্ছে না জেনারেলের ছোট ছেলে আর কর্নেল দেলোয়ারের ছোট মেয়ের। গাইডকে ডেকে জেনারেল টাকা দিয়ে পাঠালেন মুড়ি আর কলা আনতে। অল্প কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এল গাইড। চোখে মুখে উত্তেজনার চিহ্ন। জেনারেল ওর দিকে তাকাতেই বলে উঠল, ‘তাড়াতাড়ি চা বাগানের ভেতর দিয়ে আমাদের চলে যেতে হবে।’ একটা মিলিটারির গাড়ি দেখেছে সে, তাতে দুজনকে চোখ বেঁধে বসিয়ে রাখা হয়েছে। উঠে পড়লেন সবাই। চা বাগানের ভেতর দিয়ে চলে গেলেন অনেক দূর।

ক্লান্ত শরীর টেনে-হিঁচড়ে হাজির হলেন সবাই চা বাগানের এক কুলীর বাড়িতে। ঠিক হলো রাতের অন্ধকারে রওনা হবেন সবাই।

মিসেস মঞ্জুর, মিসেস দেলোয়ার ও ছেলেমেয়েসহ খাওয়া শেষ করলে খেতে বসলেন জেনারেল আর মেজর গিয়াস। টেনশনে কেমন জানি অস্বস্তি বোধ করছিলেন মেজর রেজা। না খেয়ে বসে রইলেন বারান্দায়।

ঘেউ ঘেউ করে উঠল কুকুরগুলো। চমকে উঠলেন মেজর রেজা। ‘কুকুর ডাকছে কেন, রেজা’—ঘর থেকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন জেনারেল। ‘জানি না স্যার’—উত্তর দিলেন রেজা। ‘কুইক ভেতরে ঢুকে পড় সবাই’—নির্দেশ দিলেন জেনারেল। বাচ্চাদের নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়লেন রেজা। কুকুরগুলো একনাগাড়ে ডেকেই চলেছে। দরজার পাল্লাটা একটু ফাঁক করলেন রেজা, দূরে আবছা কয়েকজন মানুষের অস্তিত্ব টের পেলেন তিনি।

‘তোমরা পালাও মঞ্জুর, আমি ওদের দেরি করাব’—ফিসফিস করে বললেন মিসেস মঞ্জুর। ‘না, আমি পালাব না’—বললেন জেনারেল। ‘রেজা, তুমি আর গিয়াস চলে যাও’, রেজার দিকে তাকালেন তিনি। মেজর রেজা গেলেন না। অনেক কষ্টে মেজর গিয়াসকে রাজি করানো গেল। তিনি বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে।

অনেকটা ডুব সাঁতার দিয়ে খালের ওপর ঢেকে থাকা ঝোপটার নিচে ভেসে উঠলেন রেজা। ঝাঁকুনি দিয়ে পানি ঝরালেন স্টেনগানের। জেনারেল নির্দেশ দিয়েছেন যা কিছুই ঘটুক না কেন গুলি যেন না ছোটে রেজার স্টেনগান থেকে। খালের ওপরের ঝোপটায় অনেকটা জোর করেই লুকিয়েছেন জেনারেলকে। অনেকগুলো হুইসেলের শব্দ শুনলেন রেজা। স্পষ্ট শুনলেন জেনারেল মঞ্জুরের কণ্ঠ, ‘তোমরা এগোবে না। আমি নিজেই আসছি।’

অনেকক্ষণ চুপচাপ। ঝোপ থেকে খালের পার থেকে মাথা তুললেন রেজা। জেনারেল ছেলেমেয়ে নিয়ে গাছের কাছে বসে সিগারেট খাচ্ছেন নির্বিকার চিত্তে। সামনে স্টেনগান নিয়ে পুলিশের একজন হাবিলদার আর কয়েকজন পুলিশ। মেজর রেজাকে প্রথম দেখল জেনারেল মঞ্জুরের মেয়ে নিতু। বলে উঠল, ‘পাপা রেজা আংকেল।’ মেজর রেজা ততক্ষণে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।

প্রশ্ন ভরা দৃষ্টি নিয়ে রেজার দিকে তাকালেন জেনারেল। বললেন, ‘Why have you surrendered Reza?’ সোজাসুজি উত্তর দিলেন রেজা, ‘আপনার মতো একজন জেনারেলের মৃত্যুর কাছে আমার মতো একজন মেজরের মৃত্যু কিছুই না। I want to die with you Sir’, অবাক বিস্ময়ে হাত রাখলেন জেনারেল রেজার কাঁধে, চোখ দুটো তাঁর ঝাপসা হয়ে এল।

হাটহাজারী থানার সামনে ভিড় উপচে পড়েছে। রেডিও শুনে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে সবার মনে। জেনারেল মঞ্জুরকে তারা এক নজর দেখতে চায়। একটা খালি রিকশার ওপরে উঠে থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার থানার সামনে ভিড় না বাড়িয়ে চলে যেতে বলছেন সবাইকে।

টিনের ছাউনি দেওয়া পুলিশের ওয়্যারলেস রুমের বাঁশের তৈরি খাটের ওপর বসে আছেন সপরিবারে জেনারেল ও দেলোয়ারের পরিবার। মেজর রেজাও বসে আছেন একপাশে। চোখে সানগ্লাস, একটার পর আরেকটা সিগারেট টেনে চলেছেন জেনারেল মঞ্জুর।

ক্যাপ্টেন এমদাদকে নিয়ে সেনাবাহিনীর একটা গাড়ি ঢুকল থানায়। সবাই তখন পুলিশের ট্রাকে বসে আছেন। এমদাদ এগিয়ে এসে সবাইকে ট্রাক থেকে নেমে সেনাবাহিনীর গাড়িতে উঠতে অনুরোধ জানালেন। নামল না কেউ। ক্যাপ্টেন এমদাদ কি যেন বললেন, সঙ্গে আসা সৈনিকদের। একজন সুবেদার কয়েকজন সৈনিকসহ এগিয়ে গেলেন জেনারেলের দিকে। ‘নেমে আসেন’, অত্যন্ত কর্কশ শোনাল সুবেদারের গলা। ‘আমি পুলিশের সঙ্গে যেতে চাই’, স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন জেনারেল। একটুও সময় না দিয়ে কথা বলার সময় তোলা জেনারেলের হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে ট্রাক থেকে নামিয়ে ফেলল সুবেদার। ঝটপট পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল হাত আর চোখ। ওই অবস্থাতেই সেনাবাহিনীর ট্রাকের পেছন দিকটাতে তুলে ফেলল তারা জেনারেলকে। সব বন্দীদের টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে তোলা হলো সেনাবাহিনীর ট্রাকটাতে। চোখ বাঁধা অবস্থায়ও টের পেলেন জেনারেল মঞ্জুর, অনেকগুলো গাড়ি একসঙ্গে চলেছে চট্টগ্রামের দিকে। সেনাবাহিনীর হাতে মঞ্জুরকে সোপর্দ করার সিদ্ধান্ত সরাসরি এসেছিল ঢাকা থেকে।

তারপরের ঘটনা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। বিভিন্নভাবে ধরা পড়লেন বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িত অফিসারেরা। কেউ কেউ আত্মসমর্পণ করলেন। খালেদ দু-তিন মাস পালিয়ে থেকে রাজশাহী সীমান্ত দিয়ে ভারত-নেপাল হয়ে চলে যান ব্যাংকক। সেখানে ১৯৯০ সালে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মেজর মোজাফফর আগরতলা থেকে চলে যান বিদেশে। কারাগারে বসেই বন্দীরা জানতে পারেন ধরা পড়ার দিন ঢাকার নির্দেশে সেনানিবাসে নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলি করে হত্যা করা হয় মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে। চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কবরস্থানে মেজর জেনারেল মঞ্জুর লে. ক. মতি এবং লে. ক. মাহবুবের কবর রয়েছে।

সুত্র: আজকের পত্রিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা