• বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ০৫:৪৯ অপরাহ্ন

শিক্ষায় ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার কারণ ও প্রতিকার

লেখক: মো. রহমত উল্লাহ্: / ৬ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬

বিগত বেশ কয়েক বছর যাবত বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা অনেক পিছিয়ে পড়েছে! ভর্তিতে, লেখাপড়ায়, পরীক্ষায় অংশগ্রহণে, পাশের হারে ও ফলাফল অর্জনে সব দিক থেকেই ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। কমেছে মেয়েদের ড্রপ আউটের পরিমাণ। শিক্ষার প্রতিটি স্তরে অর্থাৎ প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও এমনটি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ছেলেদের তুলনায় কম হলেও ভালো ফলাফলে অর্জনে মেয়েরাই উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে। মেয়েদের এগিয়ে যাওয়া যেমন আনন্দের, ছেলেদের পিছিয়ে পড়া তেমনি উদ্বেগের!

আমাদের উচিত ছেলেদের ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ার সকল কারণ পুঙ্খানুপুঙ্খ চিহ্নিত করে ব্যাপক পর্যালোচনা করে বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সমাধানের পথ উদঘাটন করা ও দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বাস্তবে শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের দেশে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার অনেক ছোট-বড় কারণ বিদ্যমান। এ স্বল্প পরিসরে সবকিছু তুলে ধরে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব নয়। তাই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বা বাস্তবতা তুলে ধরে এর সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

একটু পিছনে তাকালেই দেখা যাবে ছেলেদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল আমাদের মেয়েরা। মেয়েদের এগিয়ে আনার জন্য আমরা গ্রহণ করেছি বিভিন্ন পদক্ষেপ। অর্জন করেছি ব্যাপক সফলতা। যেতে হবে আরো অনেক দূর। শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েরা এখন ছেলেদের তুলনায় সংখ্যায় ও ফলাফলে অনেক এগিয়ে। আমরা মেয়েদের উৎসাহ উদ্দীপনা দেয়া, উপবৃত্তি দেয়া, অভিভাবকদের সচেতন করা, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা, শিশুশ্রম রোধ করা ইত্যাদি কার্যক্রম চলমান রেখেছি। ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান শুরু করা হয়। ২০০২ সালে তা উন্নীত করা হয় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে। আমাদের কন্যা শিশুরা এই কার্যক্রম গুলোর অধিক সুফল অর্জন করেছে তাই তাদেরকে ধন্যবাদ। অথচ প্রায় ১৫ বছর পরে ২০০৯ সালে এসে দরিদ্র পরিবারের ছেলে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির আওতায় আনা হয়েছে! রাষ্ট্রীয়ভাবে মেয়েদের প্রতি তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে ছেলেদেরকে অবহেলা করা হয়েছে কিনা তা কিন্তু আমরা ভেবে দেখিনি!

কন্যা শিশুদের এখন আর সেই আগের মত বাসা-বাড়িতে থেকে কাজ করতে দেখা যায় না। প্রায় সবাই উপবৃত্তির টাকা ঠিক রাখার জন্য নিয়মিত স্কুলে যায়। এটি অবশ্যই একটি শুভ লক্ষণ। এর জন্যই তো আমরা অপেক্ষায় ছিলাম। আমরা চেয়েছিলাম শিশুশ্রম থেকে বেরিয়ে আসুক পুত্র-কন্যা নির্বিশেষে সকল শিশু। কিন্তু এখনো আমরা দেখতে পাচ্ছি পুত্র শিশুরা টেম্পুতে, গ্যারেজে, কারখানায়, নৌকায়, মাছ ধরায়, ইটভাটায়, হাটবাজারে, দোকানপাটে, মাঠে-ঘাটে, ক্ষেত-খামারে, টি-স্টলে হোটেল-রেস্টুরেন্টে ইত্যাদি অগণিত ক্ষেত্রে কায়িক শ্রম দিয়ে সামান্য উপার্জন করে নিজে জীবন ধারণ করছে ও পরিবারকে সহায়তা করছে। এমন অনেক শিশুর সঙ্গে আমি কথা বলে জেনেছি, তারা লেখাপড়া করতে চায়, কিন্তু সুযোগ পাচ্ছে না! নানান ধরনের অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে! দারিদ্র্যের কষাঘাতে নিষ্পেষিত এমন পুত্রশিশুরা স্কুলে ভর্তি হয় না। কেউ কেউ মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। আবার অনেকেই স্কুলে/ মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে দুএক বছর পরেই ঝরে পড়ে।

অপরদিকে মেয়ে শিশুদের তুলনায় অধিক সংখ্যক ছেলেশিশু বাইরে বেশি সময় কাটায়, নেশাগ্রস্থ হয়ে থাকে, মাদকদ্রব্য কেনাবেচা করে, বেপরোয়া মোটরবাইক হাঁকায়, কিশোর গ্যাংএ জড়িত থাকে, চাঁদাবাজি করে, রাজনৈতিক নেতাদের পিছনে সময় ব্যয় করে, ঝগড়া বিবাদে জড়িত থাকে, নিয়ন্ত্রণহীন আচরণ করে, সারাক্ষণ গেইম চালায়, সারাদিন খেলাধুলা করে, আনন্দ আয়োজন করে, ফার্মের মুরগি চুরি করে, কৃষকের ফল-ফসল চুরি করে, দলে দলে ঘুরে বেড়ায় ইত্যাদি অনেক কিছুতেই অধিক হারে ছেলেরা জড়িয়ে পড়ায় অনেক বেশি পিছিয়ে পড়ছে। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও এমন অশুভ চিত্র দেখা যায়। মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা বেশি মাত্রায় বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত বিধায়, শিক্ষক ও অভিভাবকের সঙ্গে বেশি বেয়াদবি করে বিধায় ছেলেদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ায় আমরা হাল ছেড়ে দিচ্ছি কিনা তা ভাবতে হবে বিশেষভাবে। তা না হলে আরো বেশি সংখ্যক ছেলেরা কর্মের অনুপযোগী হয়ে বেকারত্বে নিমজ্জিত হয়ে পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা বাড়িয়ে তুলবে বহুগুণ! আমরা যদি অসহায়ের মত বা দায়িত্বহীনের মত বসে থাকি তাহলে আর রক্ষা পাবো না কেউ।

এমন এক সময় ছিল যখন এলাকার সকল ছেলেদের শাসন-বারণ করার অধিকার ছিল সকল বড়দের। স্বার্থহীন আদর-স্নেহ দিয়ে অর্জন করে সেই অধিকার প্রয়োগ করতো বড়রা; আর নির্দ্বিধায় তা মেনে নিত ছোটরা। একজনের সন্তানের কল্যান চিন্তায় সক্রিয় থাকত শতজন অভিভাবক। বড়দের নেতৃত্বে ছোটরা করতো খেলাধুলা, শিক্ষামূলক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজ। আমি নিজেও কর্মী হয়ে অংশ নিয়েছি এবং পরে নেতৃত্ব দিয়েছি এমন অনেক কাজে। আমাদের প্রিয় শিক্ষকগণও অংশ নিতেন আমাদের সাথে। তখন শিশুরা বেড়ে উঠত অন্যের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করার মানসিকতা নিয়ে। কেউ বিপথে গেলে সবাই মিলে তাকে আনা হতো সুপথে। তেমন মানসিকতা নিয়ে আবার এগিয়ে আসতে হবে সবার।

উল্লিখিত কারণগুলোর পাশাপাশি খুঁজে দেখতে হবে ছেলেদের ড্রপ আউট হবার ও পিছিয়ে পড়ার অন্যান্য কারণ। তবে মনে রাখতে হবে, এখন পাল্টে গেছে পরিবেশ ও পরিস্থিতি। সেই সাথে পাল্টে গেছে ডিজিটাল যুগের ছেলেমেয়েদের নিয়ন্ত্রণ কৌশল। তাই অভিভাবক ও শিক্ষকদের অবশ্যই শিখতে হবে স্মার্ট পেরেন্টিং, ইফেক্টিভ টিচিং। সবার আগে সক্রিয় হতে হবে শিক্ষক ও অভিভাবকদের। পর্যাপ্ত সাপোর্ট দিয়ে তৈরি করতে হবে আরো যোগ্য-দক্ষ সফল শিক্ষক। ছেলেমেয়েদের লালন-পালন তথা শিক্ষাদানে ঘরে-বাইরে থাকতে হবে আরো অনেক বেশি সতর্ক ও সক্রিয়। অভিভাবক, শিক্ষক, প্রশাসক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ মিলে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে কার্যকর পরিকল্পনা। থাকতে হবে সরকারের সদিচ্ছা। মেয়ে বা ছেলে কাউকে দমিয়ে রেখে নয়, উভয়কে এগিয়ে এনে অর্জন করতে হবে সমতা। উভয়কেই এগিয়ে নিতে হবে সমান তালে। রাখতে হবে সঠিক পথে।

লেখক: অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ ও শিশুসাহিত্যিক
rahamot21@gmail.com

সুত্র: বাংলাদেশ জার্নাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা