ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শেষ হবার পর বাংলাদেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, গণভোটে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিপরীতে ‘না’ ভোট পড়েছে পড়েছে ২৯ দশমিক ৩২ শতাংশ; অথচ এরপরও সংবিধানে নেই বলে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এটিকে মানছে না। এই না মানা কি শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই প্রথম নাকি এর আগেও এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল বিভিন্ন দেশের জনগণকে? আসুন দেখে নেওয়া যাক।
বিশ্বের বহু দেশে গণভোট বা রেফারেন্ডাম হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে কার্যকর হয়নি, কোথাও আবার বাধ্যতামূলক আইন ছিল না, আবার কোথাও যথেষ্ট ভোটার উপস্থিতি না থাকায় তা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। গণভোটকে সরাসরি গণতন্ত্রের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার মনে করা হয়, কিন্তু বাস্তবে সব গণভোট আইনগত ফলাফল অর্জন বা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে রূপান্তরিত হয় না।
অতীত এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার কর্তৃক গণভোটের রায় সরাসরি উপেক্ষা বা ভিন্নভাবে কার্যকর করার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ রয়েছে। নিচে প্রধান কয়েকটি দেশের তালিকা দেওয়া হলো :
গ্রিস : গ্রিসের জনগণ গণভোটের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের দেওয়া কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতিকে ৬১ শতাংশ ভোটে প্রত্যাখ্যান করে। তবে অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে গ্রিক সরকার জনগণের সেই রায় উপেক্ষা করে কয়েক দিন পরেই আরও কঠোর শর্তে বেলআউট চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। কারণ গ্রিস আশঙ্কা করছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে গেলে তাদের অর্থনীতি ধ্বংস এবং তারা দেউলিয়া হয়ে যাবে।
ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডস : ২০০৫ সালে একটি নতুন ইউরোপীয় সংবিধান গ্রহণের প্রস্তাব এই দুটি দেশে গণভোটের মাধ্যমে বিপুল ব্যবধানে প্রত্যাখ্যাত হয়। তবে সরকার সরাসরি সেই প্রস্তাব বাস্তবায়ন না করলেও ২০০৭ সালে প্রায় একই রকম বিষয়বস্তু নিয়ে লিসবন চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা কার্যত গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হিসেবে ধরা হয়ে থাকে।
আয়ারল্যান্ড : আইরিশ জনগণ ২০০১ সালে নাইস চুক্তি এবং ২০০৮ সালে লিসবন চুক্তি গণভোটে প্রত্যাখ্যান করেছিল। উভয় ক্ষেত্রেই সরকার প্রথম ফলাফল কার্যকর না করে জনগণকে পুনরায় ভোট দিতে উৎসাহিত করে এবং পরের বছর দ্বিতীয় দফায় গণভোট আয়োজন করে ‘হ্যাঁ’ ভোট নিশ্চিত করে প্রস্তাবগুলো কার্যকর করে।
স্কটল্যান্ড : স্কটল্যান্ডে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে গণভোটে ৫১.৬ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলেও একটি বিশেষ শর্তের (মোট ভোটারের অন্তত ৪০% সমর্থন থাকতে হবে) কারণে ব্রিটিশ সরকার সেই ফলাফলকে অগ্রাহ্য করে এবং আইনটি বাতিল করে দেয়।
সুইজারল্যান্ড : ২০১৬ সালে বিবাহিত দম্পতিদের ট্যাক্স সংক্রান্ত একটি গণভোটের রায় পরবর্তীতে সুইস সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেয়। আদালত জানায়, সরকার ভোটারদের অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়েছিল, যার ফলে ভোটারদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। আধুনিক সুইজারল্যান্ডের ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো গণভোটের রায় বাতিলের ঘটনা।
স্পেন : ২০১৭ সালে স্পেন এবং কাতালোনিয়ার গণভোটেও এরকম একটা ঘটনা ঘটেছে। কাতালোনিয়া বহুদিন ধরেই স্পেন থেকে আলাদা রাষ্ট্র গঠন করতে চেয়েছিল। সেই উদ্দেশ্যেই গণভোটের আয়োজন করা হয়। গণভোটে ৯২ শতাংশ ভোট ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে থাকা সত্ত্বেও সরকার সেই ভোট কার্যকর করেনি। স্পেন সরকার তো আগেই এই গণভোটকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল। সরকার থেকে বলা হয়েছিল, সংবিধানে বিচ্ছিন্নতার অনুমতি নেই। এতে জাতীয় ঐক্য ভেঙে যেতে পারে। এজন্য তারা ফল মানেনি। পরে কাতালোনিয়ার সরকার ভেঙে দেওয়া হয় এবং সেখানে কেন্দ্রীয় শাসন জারি করা হয়।
ইরাক : ইরাকের কুর্দি অঞ্চল বহু বছর ধরেই স্বাধীনতার দাবি করছিল এবং সেখানে একটা গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ৯২ শতাংশ গণভোটের পক্ষে ছিল। যদিও পরে ইরাক সরকার সেই ফলাফল সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়।
নর্থ মেসিডোনিয়া : এছাড়াও নর্থ মেসিডোনিয়া নাম পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে দেশটিতে গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল ২০১৮ সালে। ভোটের ফলাফল ৯১ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে আসলেও সেই ফলাফল অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল। কারণ হিসেবে বলা হয়, ভোটে ন্যূনতম ভোটারের উপস্থিতি না থাকা। তারপরও পার্লামেন্টে আইন পাস হয় এবং দেশের নাম বদলিয়ে উত্তর মেসিডোনিয়া রাখা হয়।
কলম্বিয়া : ২০১৬ সালের কলম্বিয়ার ঐতিহাসিক গণভোটে ভোটাররা সরকার এবং ফার্ক বিদ্রোহীদের মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তিটি অল্প ব্যবধানে (৫০.২% ‘না’ বনাম ৪৯.৮% ‘হ্যাঁ’) প্রত্যাখ্যান করেছিল, যা পুরো বিশ্বকে হতবাক করেছিল। ৫২ বছরের পুরোনো সশস্ত্র সংঘর্ষ অবসানের এই চুক্তিটি সাবেক প্রেসিডেন্ট আলভারো উরিবের বিরোধিতার মুখে পড়ে, যিনি এটিকে বিদ্রোহীদের প্রতি বেশি নমনীয় বলে মনে করেছিলেন। অল্প ব্যবধানে ‘না’ ভোট জিতলেও পরে সংসদের মাধ্যমে সেই চুক্তি পাস করানো হয়।
হাঙ্গেরি : ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর হাঙ্গেরিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাধ্যতামূলক শরণার্থী পুনর্বাসন কোটার বিরুদ্ধে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওর্বান এবং তার সরকার এই ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করেছিল, কিন্তু কম ভোটার উপস্থিতির (৪৩%) কারণে গণভোটটি আইনত অকার্যকর হয়ে পড়ে, যদিও ৯৮% ভোটার কোটার বিপক্ষে ভোট দেন।
উল্লেখ্য, অনেক দেশে গণভোট কেবল পরামর্শমূলক হয়ে থাকে, যা সরকারের ওপর আইনত বাধ্যতামূলক নয় । তবে রাজনৈতিক চাপের কারণে সরকার সাধারণত এগুলো উপেক্ষা করতে পারে না।
সুত্র: কালবেলা