নেত্রকোণার কলমাকান্দা উপজেলায় কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় “দমদমা” খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কাগজে-কলমে ১২৭ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থানের কথা উল্লেখ করে বিপুল বরাদ্দ দেওয়া হলেও, বাস্তবে মাঠে পাওয়া গেছে ৫০ জনেরও কম শ্রমিক। একইসঙ্গে প্রকল্পের মূল খননকাজ শ্রমিকদের পরিবর্তে ‘ভেকু’ (খননযন্ত্র) দিয়ে করানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পর্যায়ে খারনৈ ইউনিয়নের “দমদমা” খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ৫১ লাখ ৩১ হাজার ৯৫৪ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রায় ১ হাজার ৫২০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই খালে ১২৭ জন শ্রমিকের নিয়োজিত থাকার কথা। শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা এবং কাজের মেয়াদ ৪০ কর্মদিবস। এছাড়া সর্দার ভাতা ধরা হয়েছে ৪ হাজার টাকা।
প্রকল্পের তথ্যফলক অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল কাজ শুরু হয়ে ৬ জুন শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময় পার হয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ অতিবাহিত হলেও কাজ এখনো শেষ হয়নি।
সম্প্রতি সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত শ্রমিকরা খাল খননের পরিবর্তে খালের পাড়ে মেহগনি গাছের চারা রোপণের কাজে ব্যস্ত। অথচ নিয়মানুযায়ী প্রতিদিন ১২৭ জন শ্রমিক কাজ করার কথা থাকলেও সেখানে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৪৫ থেকে ৫০ জন।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৪০ দিনের কর্মসূচির মধ্যে প্রায় ২৪ দিনের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তাদের দাবি, প্রকল্পের মূল খনন কাজ শ্রমিক দিয়ে না করিয়ে ভেকু ব্যবহার করে গোপনে সম্পন্ন করা হয়েছে। পরে নামমাত্র উপস্থিত থাকা শ্রমিকদের খালের পাড় সংস্কার ও চারা রোপণের কাজে নিয়োজিত করা হয়।
প্রকল্প পরিচালনায়ও চরম নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সরকারি বিধি অনুযায়ী শ্রমিকদের সর্দারের (দলনেতা) কাছে হাজিরা খাতা থাকার কথা থাকলেও, বাস্তবে তা রয়েছে খারনৈ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আসাদ মিয়ার কাছে।
শ্রমিকদের দাবি, তিনিই পুরো প্রকল্পের কাজ ও অর্থ নিয়ন্ত্রণ করছেন।
শুধু তাই নয়, খাল খননের অর্থ দিয়ে বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক ও একটি বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তা সংস্কারের কাজেও এই শ্রমিকদের ব্যবহার করা হচ্ছে, যা প্রকল্পের নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। কাজে নিয়োজিত কয়েকজন আদিবাসী শ্রমিকের সঙ্গে কথা বললে তারা প্রকল্পের সর্দারের নাম পর্যন্ত বলতে পারেননি। হাজিরা খাতা কোথায় রাখা হয় বা কীভাবে উপস্থিতি যাচাই করা হয়, সে বিষয়েও কোনো তথ্য নেই তাদের কাছে।
এদিকে এই প্রকল্পের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ করেছেন দমদমা গ্রামের কৃষক মার্কণ্ড দয়াল হাজং। তিনি দাবি করেন, সরকারি খালের নির্ধারিত ম্যাপ অনুসরণ না করে তার ব্যক্তিমালিকানাধীন ফসলি জমির ওপর দিয়ে জোরপূর্বক খাল খনন করা হয়েছে।
মার্কণ্ড দয়াল হাজং ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার প্রায় ৫ থেকে ৬ কাঠা জমি খালের মধ্যে নিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে আমার ধানের ক্ষেত সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে এবং সেচের মোটরটি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সরকারি খালের মূল হালট (নকশা) বাদ দিয়ে অন্যায়ভাবে আমার জমির ওপর দিয়ে খাল নেওয়া হয়েছে। আমি প্রশাসনের কাছে এর তীব্র বিচার চাই।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য আশাদ মিয়া বলেন, দমদমা খালের কাজ এখনো চলমান রয়েছে। বর্তমানে গাছের চারা রোপণের কাজ চলছে। ছোট গাছের চারা পাওয়া গেছে, এখন বড় গাছের চারা সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
প্রতিদিন ১২৭ জন শ্রমিক থাকার কথা স্বীকার করলেও মাঠে উপস্থিতি কেন এত কম, সে বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এমনকি হাজিরা খাতা নিজের কাছে রাখার বিষয়েও তিনি স্পষ্ট জবাব দেননি।
খারনৈ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওবায়দুল হক অবশ্য দায় এড়িয়ে বলেন, ৪০ দিনের কর্মসূচির নির্ধারিত সময় শেষ হয়েছে। এখন যারা কাজ করছে, তারা অতিরিক্ত কাজে নিয়োজিত রয়েছে।
অন্যদিকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মমিনুল ইসলাম বলেন, খনন ও সংস্কার কাজে শ্রমিকরা তাদের দায়িত্ব পালন করছে। এক প্রকল্পের শ্রমিককে অন্য প্রকল্পে বা অন্যত্র কাজে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এলাকাবাসীর দাবি, বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
সুত্র: কালবেলা