• মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ০৫:২৪ অপরাহ্ন

অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে দেখতে পুলিশের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২০ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে দেখতে পুলিশের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ
পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ

রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের অপরাধী হিসেবেই দেখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সরকারের আপসহীন অবস্থানের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছেন। পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশ দেন। গতকাল সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে ওই অনুষ্ঠান হয়। এতে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা অংশ নেন।

পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দমনে কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় আপনাদের রাজনৈতিক পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাবের মুখোমুখি হতে হয়। আমি আজ পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, কারও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করবেন না। যে অপরাধ করবে, তাকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করবেন। আইনের প্রয়োগ সবার জন্যই সমান।’

সরকার দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের সঙ্গে কোনো আপস করতে চায় না জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবে পালনে সক্ষমতার পরিচয় দিলে বর্তমান সরকারও নিরাপদ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে একধাপ এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।’ পুলিশ বাহিনীর কল্যাণে সরকার কাজ করে যাবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সততা, মেধা ও দক্ষতাই হবে প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নের মূলনীতি।’

প্রযুক্তির কারণে অপরাধের ধরন বেড়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘যেহেতু অপরাধের ধরন পরিবর্তন হয়েছে, ফলে পুলিশ প্রশাসনের কার্যক্রমের পরিধিও ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়েছে। সুতরাং বর্তমানে পুলিশি কার্যক্রম এখন আর কয়েক দশক আগের মতো শহর-নগর কিংবা জেলার মধ্যে সীমবদ্ধ নয়।’

ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম বৈষয়িক বাস্তবতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ কারণে আমাদের প্রত্যেক পুলিশ কর্মকর্তাকে বহুমুখীভাবে দক্ষ হওয়া প্রয়োজন। এটি এখন সময়ের দাবি। এমন বাস্তবতায় পুলিশ প্রশাসনে নির্দিষ্ট কিছু পদ নয়, প্রতিটি পদই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং প্রশাসনের সব পদেই কাজ করার পেশাদারি মানসিকতা থাকা জরুরি।’

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বক্তব্য দেন পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন। এ ছাড়া কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা তাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। পাশাপাশি দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ পুলিশ সব সময় সরকারকে সহায়তা করতে প্রস্তুত বলেও জানান তারা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠান শেষে টাইগার গেটের সামনে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন।

কোনো পদ কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়: পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু পদোন্নতি কিংবা নিজেদের পছন্দের জায়গায় পোস্টিংয়ের জন্য পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হয়তো সাময়িক তুষ্টি লাভ করেন, তবে সেটি পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস করা হয়। আপনাদের প্রতি আমার বিশেষ আহ্বান, পুলিশ প্রশাসনে আপনাদের ওপর যার যেখানে দায়িত্বভার অর্পিত হয়, সেই কাজটি গুরুত্বসহকারে পালন করবেন। তাহলেই আমরা অবশ্যই একটি দক্ষ গতিশীল এবং পেশাদার পুলিশ প্রশাসন নিশ্চিত করতে সক্ষম হবো।’

ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই সরকার পাঁচ বছরের জন্য। একইভাবে জনপ্রশাসন কিংবা পুলিশ প্রশাসনের কোনো পদও কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়। এ কারণে আমি আজকের এই সভাটিকে কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখতে চাই না। বরং এই সভাটি হয়ে উঠুক দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আগামী দিনের পথ নির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারের মুহূর্ত।’

সরকার জনবান্ধব এবং জনগণের আস্থাভাজন পুলিশ প্রশাসন চায়: চব্বিশের ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গত দেড় বছরে বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতি পুলিশ কৌশলগতভাবে মোকাবিলা করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে।’

সরকার পুলিশকে সত্যিকারের জনবান্ধব বাহিনীতে রূপ দিতে চায় জানিয়ে তিনি বলেন, এ সরকার এমন একটি পুলিশ প্রশাসন চায় যেটি হবে জনবান্ধব এবং জনগণের আস্থাভাজন। কারণ, যে কোনো দেশেই জনগণ সাধারণত পুলিশ প্রশাসনকে সরকারের আয়না হিসেবেই বিবেচনা করে। সরকারকে জনগণ কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তার অনেকটাই পুলিশের আচরণ ও কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে। তাই রাষ্ট্র পুলিশের কাছে সততা, দক্ষতা, সেবা, ন্যায়পরায়ণতা, পেশাদারিত্ব ও মানবিকতা প্রত্যাশা করে।’

বর্তমান সরকার অবশ্যই জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত রাখতে চায় স্মরণ করিয়ে দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক হবে আইনগত এবং মানবিক। তবে কেউ যেন সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট কিংবা কোনো রকমের নাশকতামূলক কার্যক্রমে লিপ্ত হতে না পারে এটিও আমাদের সবাইকে লক্ষ্য রাখতে হবে।’

সরকার নির্বাচনি ইশতেহার এবং জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে আপনাদের কাছে একটি বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার, সেটি হলো বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহার এবং জনগণের সামনে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি দফা, প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। এ নিয়ে কারও মনে কোনো সংশয়ের কারণ নেই।’

দল-মত নির্বিশেষে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি মানুষকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে নিয়ে আসা সরকারের উদ্দেশ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণের নিরাপত্তার বিষয়টি পুলিশ সদস্যদের সবার আগে বিবেচনায় রাখতে হবে। এ জন্য তাদের যেখানে যে দায়িত্ব দেওয়া হবে, সেটি গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করতে হবে।’

চেইন অব কমান্ড ও ডিসিপ্লিনে কোনো আপস নয়: অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশ বাহিনীতে দুর্নীতির কোনো স্থান নেই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কঠোরভাবে বজায় রাখা হবে এবং বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ও ডিসিপ্লিন রক্ষায় কোনো আপস করা হবে না।

পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে অপরাধের ধরন ও মাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। সেজন্য সাইবার ক্রাইম, সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব এবং অপপ্রচার প্রতিরোধে একটি বিশেষায়িত ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ গঠন করা হবে।

অপারেশনাল কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে বডিওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার বাড়ানোর নির্দেশ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী ন্যূনতম বল প্রয়োগ নীতি অনুসরণে পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। অপরাধ দমনে কৌশলী হতে হবে, তবে কোনো অবস্থাতেই মানবাধিকার লঙ্ঘন করা যাবে না।’

প্রতিটি থানাকে সেবার কেন্দ্রে পরিণত করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, আধুনিক পুলিশিং ডকট্রিন অনুযায়ী প্রিভেন্টিভ পুলিশিং বা অপরাধ সংঘটনের আগেই তা প্রতিরোধের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। সেবার মানোন্নয়নে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট ও অনলাইন জিডিসহ সব ধরনের সেবা দ্রুততম সময়ে দিতে হবে। ট্যুরিস্ট পুলিশের সক্ষমতা বাড়িয়ে পর্যটন খাতের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার ওপরও গুরুত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

জঙ্গল সলিমপুরে হচ্ছে পুলিশের দুটি প্রশিক্ষণ একাডেমি, জায়গা পেলে স্পোর্টস কমপ্লেক্স: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, পুলিশের পেশাদারিত্ব বাড়াতে চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে দুটি নতুন পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি হবে এলিট ফোর্সের জন্য এবং অন্যটি সাধারণ ফোর্সের জন্য। এলিট ফোর্সের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আলাদা আইন প্রণয়ন করা হবে বলেও জানান তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো ও আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাছাড়া জমি প্রাপ্তি সাপেক্ষে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘পুলিশ স্পোর্টস কমপ্লেক্স’ নির্মাণ করা হবে।

উল্লেখ্য, গত রোববার রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে চার দিনব্যাপী পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ পুলিশ সপ্তাহ শেষ হবে আগামীকাল বুধবার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা