১৯৮১ সালের ৩০ মে, সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্যের হাতে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান নিহত হন। বহুল আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কাহিনি তখন পর্যন্ত ছিল গোপনীয়তার আবরণে ঢাকা। বিভিন্ন সূত্র থেকে সংগৃহীত জানা-অজানা বহু তথ্যের সমাবেশে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সাউথ এশিয়ান মনিটরের সম্পাদক ও অধুনালুপ্ত প্রোব নিউজের প্রধান সম্পাদক ইরতিজা নাসিম আলী। ১৯৯৪ সালের ৩০ মে থেকে প্রতিবেদনটি আট পর্বে ধারাবাহিক ছাপা হয়েছিল মতিউর রহমান সম্পাদিত তৎকালীন দৈনিক ভোরের কাগজে। লেখকের অনুমতি নিয়ে আজকের পত্রিকার পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি আবার প্রকাশ করা হলো। আজ দ্বিতীয় কিস্তি।
মেজর মোজাফফর জানালেন, The President has been killed. মেজর জেনারেল মঞ্জুর কথাটা শুনে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। একটু ধাতস্থ হয়ে মেজর মোজাফফরকে বললেন, ডিভিশনাল স্টাফ অফিসার, ব্রিগেড কমান্ডারসহ সব সামরিক ঊর্ধ্বতন অফিসার যেন সকাল ৭টার মধ্যে তাঁর দপ্তরে হাজির হয়।
টেলিফোন নামিয়ে তৈরি হয়ে নিলেন মেজর জেনারেল মঞ্জুর। বেসামরিক পোশাক পরে নিজের স্টাফ গাড়িতে উঠে বেরিয়ে গেলেন বাসা থেকে। ষষ্ঠ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের দপ্তরে এসে থামল গাড়িটা। তাঁকে নামতে দেখে এগিয়ে আসেন ষষ্ঠ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর দোস্ত মোহাম্মদ শিকদার। অবিলম্বে সিগন্যাল সেন্টারে প্লাটুন মোতায়েন এবং কুমিল্লা থেকে সম্ভাব্য আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার জন্য শুভপুর ব্রিজে সৈন্য পাঠাতে বলে গাড়িতে আবার উঠে বসলেন মঞ্জুর। ঝড়ের বেগে তাঁর গাড়ি ছুটে চলল প্রধান দপ্তরের দিকে।
তৎকালীন বিএমএ কমান্ড্যান্ট একজন ব্রিগেডিয়ার এবং ব্রিগেডিয়ার শাহজাহানসহ মোট ৪০ জন সামরিক অফিসার ইতিমধ্যেই পৌঁছে গিয়ে অপেক্ষা করছিলেন চট্টগ্রামের ডিভিশনাল কমান্ডার মেজর জেনারেল মঞ্জুরের জন্য। উপস্থিত অফিসারদের সামনে দৃঢ়কণ্ঠে বললেন মঞ্জুর, ‘কিছু সেনা অফিসার প্রেসিডেন্ট জিয়াকে হত্যা করেছে।’ উপস্থিত সবার দৃষ্টি জেনারেলের দিকে। একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘এ হত্যাকাণ্ড ঘটার পেছনে অবশ্যই অফিসারদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ কাজ করছে। সেনাবাহিনীর ভেতরে মুক্তিযোদ্ধা এবং অমুক্তিযোদ্ধাদের একটা দ্বন্দ্ব অনেক দিন থেকেই বিরাজ করছে। মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মাঝে জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশই এ হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ। ঘটনা যখন ঘটে গেছে তখন আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আপনারা আপনাদের মতামত নির্দ্বিধায় বলতে পারেন।’ উপস্থিত ৪০ জন অফিসারই সমর্থন জানালেন হাত তুলে।
উপস্থিত একজন অমুক্তিযোদ্ধা অফিসার উঠে দাঁড়ালেন। সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, ‘আমাদের শুধু হাত তুলে এ ঘটনার প্রতি সমর্থন জানালে চলবে না, শপথ নিতে হবে।’ নিজ উদ্যোগেই দপ্তরে রাখা একটা কোরআন শরীফ নিয়ে এলেন তিনি। মেজর জেনারেল মঞ্জুরের সামনে পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ নিলেন একে একে সবাই।
সকাল ৮টার মধ্যে দপ্তরে এসে পৌঁছালেন চট্টগ্রামের কমিশনার, পুলিশ কমিশনার, রাইফেলসের সেক্টর কমান্ডার, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর কমান্ডিং অফিসারসহ বিভিন্ন বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ব্রিফিং শুনে একে একে শপথ নিলেন সবাই। বেসামরিক অফিসারদের স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানালেন মঞ্জুর।
সকাল ১১টা। সকল ব্রিগেড কমান্ডার এবং ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসারদের নিয়ে বসলেন জেনারেল মঞ্জুর তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে। দায়িত্বের মধ্যে ছিল শুভপুর-সীতাকুণ্ড-চট্টগ্রাম প্রবেশ পথ বন্ধ করা। পতেঙ্গা-ফৌজদারহাট-কুমিল্লা সমুদ্রতীরে অবতরণে বাধা দেওয়া, চট্টগ্রাম বিমান বন্দর ও সমুদ্র বন্দর রক্ষা করা এবং সর্বোপরি চট্টগ্রাম সেনানিবাসকে রক্ষা করা। দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে তা সঠিকভাবে পালন করার জন্য বললেন মেজর জেনারেল মঞ্জুর। ঢাকার দিকে সমর সম্ভার নিয়ে অনেকের এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও মঞ্জুর ভিন্নমত পোষণ করলেন। তিনি সোজাসুজি বলে দিলেন, ‘আমাদের এখন ডিফেন্সিভ প্ল্যান ফলো করতে হবে।’ সেই অনুযায়ী চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করার জন্য অগ্রসর হলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত সামরিক অফিসারেরা।
বৃষ্টিভেজা রাতের হত্যাকাণ্ড: পুরো অপারেশনে সময় নিল মাত্র ৯ মিনিটবৃষ্টিভেজা রাতের হত্যাকাণ্ড: পুরো অপারেশনে সময় নিল মাত্র ৯ মিনিট
৬৯ ইনফেন্ট্রি ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর খালেদকে দায়িত্ব দেওয়া হলো তিনি যেন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য এবং তাদের অবস্থান পর্যায়ক্রমে জেনারেল মঞ্জুরকে জানানোর দায়িত্বে রইলেন মেজর মোজাফফর।
একজন ব্রিগেডিয়ারকে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললেন জেনারেল মঞ্জুর। হাসতে হাসতে বললেন, ‘আপনার তো নেগোসিয়েশন করার পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। যেমন করেছিলেন ফারুক-রশিদের ক্যু-এর সময়। সুতরাং ঢাকার সঙ্গে নেগোসিয়েশনের ব্যাপারটা আপনাকে দিয়েই সবচেয়ে ভালো হবে মনে করি।’ নির্দেশ দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন মেজর জেনারেল মঞ্জুর।
এর মাঝে কন্ট্রোল রুম থেকে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করলেন ওই ব্রিগেডিয়ার। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ প্রস্তাব দিলেন বিদ্রোহী দলকে আত্মসমর্পণ করার জন্য। কথা দিলেন, আত্মসমর্পণের পর ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের পরিবারসহ বিশেষ বিমানযোগে বিদেশে প্রেরণ করবেন। শুধু তাই নয়, আগামী ছয় মাসের মধ্যে তাদের আবার দেশে ফিরিয়ে আনার নিশ্চয়তা দিলেন তিনি।
আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাশে বসে থাকা কর্নেল মতিউর উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। ঝট করে টেনে নিলেন রিসিভার। চেঁচিয়ে বললেন, ‘আমাদের সারেন্ডার করার প্রশ্নই আসে না। সারেন্ডার যদি করতে হয় করবেন আপনারা, আমরা না।’ জেনারেল এরশাদকে স্পষ্ট কথা জানিয়ে রিসিভার নামিয়ে রাখলেন কর্নেল মতি।
ঢাকা রেডিও থেকে তখন চট্টগ্রামের বিদ্রোহী সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ ঘোষণা করা শুরু হয়ে গেছে। এরশাদের দেওয়া আত্মসমর্পণের প্রস্তাবের কথা জানানো হলো মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে। এরশাদ তাঁর সঙ্গেও কথা বলতে চান জেনে প্রত্যাখ্যান করলেন মঞ্জুর। তাঁর মনে পড়ে গেল, এই মে মাসেরই ২৮ তারিখের একটা ঘটনা।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার চট্টগ্রাম আসার সব প্রস্তুতি তখন সম্পন্ন হয়েছে। মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগেই হেলিকপ্টার নিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এসে পৌঁছালেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ। মঞ্জুরকে জানালেন, প্রেসিডেন্ট তাঁকে অতিসত্বর ঢাকার স্টাফ কলেজে যোগদান করতে বলেছেন। সেই সঙ্গে মঞ্জুরের হাতে ধরিয়ে দিলেন তাঁর বদলির আদেশখানা। ১৫ দিন আগে স্বাক্ষর করা বদলির আদেশ হাতে পেয়ে মঞ্জুর ক্ষুব্ধ হলেন। এরশাদ ও তাঁর সঙ্গীরা যে তাঁর বিরুদ্ধে এসব ষড়যন্ত্র করছে সে খবর তিনি আগে থেকেই জেনে গিয়েছিলেন। সে কারণে লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদকে হেলিপ্যাডে রিসিভ পর্যন্ত করতে যাননি।
মেজর জেনারেল মঞ্জুরের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে ঢাকায় ফিরে গেলেন এরশাদ। ফিরেই প্রেসিডেন্ট জিয়াকে মঞ্জুরের ক্ষোভের কথা জানালেন। শুধু এইটুকুতেই থেমে রইলেন না, প্রেসিডেন্টের এক ঊর্ধ্বতন স্টাফ অফিসারকে দিয়ে টেলিফোনে মঞ্জুরকে জানিয়ে দিলেন, প্রেসিডেন্ট চান না যে আগামীকাল মঞ্জুর তাঁকে রিসিভ করতে আসুক। কথাটা শুনে আশ্চর্য হয়ে এরশাদের কাছে ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য টেলিফোন করলেন মেজর জেনারেল মঞ্জুর। এরশাদ জানালেন কথাটা মিথ্যা নয়। আসলেই প্রেসিডেন্ট এ রকম বলেছেন। পরদিন প্রেসিডেন্টকে রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে গেলেন না মঞ্জুর। তাঁর বদলে ব্রিগেডিয়ার মহসিন গেলেন প্রেসিডেন্টকে রিসিভ করতে। প্রেসিডেন্ট জিয়া এয়ারপোর্টে মঞ্জুরকে না দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিগেডিয়ার মহসিনকে জিজ্ঞেস করলেন, Where is Manjur? উত্তরের অপেক্ষা না করে রাগত স্বরে বলে উঠলেন, What does he think he is!
সন্ধ্যায় মেজর জেনারেল মঞ্জুর সস্ত্রীক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন সার্কিট হাউসে। কথা-কাটাকাটি হলো প্রচুর। একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট জিয়া তাঁকে স্যাক করার কথাও বললেন। জিয়ার সঙ্গে সেটাই ছিল তাঁর শেষ সাক্ষাৎ।