• সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০৩ পূর্বাহ্ন
Headline
১৮ রাষ্ট্রপ্রধানের ৭ জনের বিদায় পদত্যাগে জিয়া হত্যা/সেনানিবাসে নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলি করে হত্যা করা হয় জেনারেল মঞ্জুরকে জিয়া হত্যা /সামনে পথ বন্ধ, ধরা পড়তেই হবে এমপির আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল: প্রতিবাদে দুধ দিয়ে গোসল করে জামায়াত ছাড়লেন কর্মী আদালত চলাকালে পেপারওয়েট ছুড়ে আইনজীবীর মাথা ফাটালেন বিচারক এমপিওভুক্ত শিক্ষক, দ্বৈত নাগরিক, ঋণখেলাপিরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না: ইসি আশুগঞ্জে খাল পুনঃখনন শেষে সরকারি কোষাগারে ফেরত গেল ৬৪ লাখ টাকা মুদ্রাস্ফীতির শঙ্কায় কমল স্বর্ণের দাম জিয়া হত্যা /মঞ্জুর নিজের কাঁধ থেকে ব্যাজ খুলে ফেললেন, স্টার্ট নিল গাড়িটা আন্দোলন শরিক নেতাদের কাছে দুঃখপ্রকাশ প্রধানমন্ত্রীর

জিয়া হত্যা /মঞ্জুর নিজের কাঁধ থেকে ব্যাজ খুলে ফেললেন, স্টার্ট নিল গাড়িটা

Reporter Name / ১৯ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

১৯৮১ সালের ৩০ মে, সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্যের হাতে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান নিহত হন। বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কাহিনি তখন পর্যন্ত ছিল গোপনীয়তার আবরণে ঢাকা। বিভিন্ন সূত্র থেকে সংগৃহীত জানা-অজানা বহু তথ্যের সমাবেশে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সাউথ এশিয়ান মনিটরের সম্পাদক ও অধুনালুপ্ত প্রোব নিউজের প্রধান সম্পাদক ইরতিজা নাসিম আলী। ১৯৯৪ সালের ৩০ মে থেকে প্রতিবেদনটি আট পর্বে ধারাবাহিক ছাপা হয়েছিল মতিউর রহমান সম্পাদিত তৎকালীন দৈনিক ভোরের কাগজে। লেখকের অনুমতি নিয়ে আজকের পত্রিকার পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি আবার প্রকাশ করা হলো। আজ পঞ্চম কিস্তি।

৩০ মে ১৯৮১। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। সারাটা দিন ধকল গেছে সবার ওপর দিয়ে। সেনানিবাসের ভেতর সবকিছু ঠিকঠাক মতোই চলছে। শহরের কোথাও থেকে কোনো গোলযোগের খবর পাওয়া যায়নি। কি হতে যাচ্ছে সে আলোচনাতে মশগুল সাধারণ মানুষ। সারাটা দিনই বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটি করে বেড়াতে হয়েছে জে. মঞ্জুরকে। একবারের জন্য বাসায় যাওয়ার সময় পর্যন্ত পাননি।

আরেকটা বিনিদ্র রাত কেটে গিয়ে সকাল হয়েছে। ৩১ মে সকাল ১১টায় সমস্ত বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এক সমাবেশ ডাকলেন জে. মঞ্জুর ডেপুটি কমিশনারের অফিসে। সবাইকে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে ঠিকঠাক মতো কাজ চালিয়ে যেতে বললেন। চট্টগ্রামের রেডিও বাংলাদেশকে ২৪ ঘণ্টা কাজ চালিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানালেন, যেন কোনো জাহাজ বন্দর ত্যাগ না করতে পারে। সেই সঙ্গে ঢাকায় যেন কোনোরকম তেল, পেট্রল না পাঠানো হয় সে ব্যাপারেও অনুরোধ জানালেন।

এদিকে সকাল ১১টার পর পরই কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে সেনাবাহিনী মার্চ করতে শুরু করেছে শুভপুর ব্রিজের দিকে। হঠাৎ করেই পরিস্থিতি কেমন ঘোলাটে হয়ে পড়তে শুরু করল। ঢাকা থেকে এয়ার অ্যাটাকেরও আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ফ্রন্ট লাইন থেকে খবর এসে পৌঁছাল শুভপুর ব্রিজ রক্ষা করার জন্য যাদের পাঠানো হয়েছিল সেই মেজর কাইউম আর মেজর দোস্ত মোহাম্মদ আত্মসমর্পণ করেছে কুমিল্লা থেকে আগত সেনাদলের কাছে। ঢাকা রেডিও থেকে এদের আত্মসমর্পণের খবর প্রচার শুরু হলো। কিছুক্ষণ পর কণ্ঠস্বরও শোনাল আত্মসমর্পণকারীদের।

মনোবল ভেঙে পড়তে লাগল সাধারণ সেনাদের। মে. জে. মঞ্জুর আঁচ করতে পারলেন, বুঝলেন মনোবল ভেঙে গেলে আর করার কিছুই থাকবে না। ডিভিশনাল হেড কোয়ার্টারের পেছনে হেলিপ্যাডে দাঁড়িয়ে আছে একটা হেলিকপ্টার। মঞ্জুরের দৃষ্টি পড়ল সেদিকে। হঠাৎ তাঁর মনে হলো হেলিকপ্টারটা এখানে থাকা উচিত না। সাধারণ সৈনিকেরা মনে করতে পারে বিপদের মুহূর্তে জেনারেল পালাতে পারে তাদের ফেলে। এ মুহূর্তে সৈনিকদের মাঝে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকতে দেওয়া যায় না। সোজা ফেরত পাঠালেন হেলিকপ্টার জে. মঞ্জুর।

ডিভিশনাল হেডকোয়ার্টারে সবাই বসে আছে। চিন্তার ছাপ সবার মুখে। পাশে লে. কর্নেল মতিউর গভীর চিন্তায় মগ্ন। হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে বললেন, ‘gentlemen we have lost the battle’। সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। চোয়াল কঠিন হয়ে উঠেছে কর্নেল মতিউরের। তবুও গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে বললেন, ‘আমাদের হাতে দুটো পথই খোলা আছে, হয় আমাদের আত্মহত্যা করতে হবে নয়তো এসকেপ করতে হবে।’

সন্ধ্যা ৬টার দিকে জে. মঞ্জুর তাঁর অফিসারদের এক বৈঠক ডাকলেন। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঢাকার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করা যায় কিনা, সে বিষয়ে মতামত জানতে চাইলেন সবার। সকলে এ বিষয়ে রাজি হলেও ভিন্নমত জানালেন লে. কর্নেল মতি ও লে. কর্নেল দিলওয়ার। তখনো তাঁরা আপস করতে রাজি নন।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে সব দিক চিন্তা করে জনৈক ব্রিগেডিয়ারকে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করতে নির্দেশ দিলেন মে. জে. মঞ্জুর। আগে যেভাবে কথা হয়েছিল অর্থাৎ বিশেষ বিমানযোগে বিদ্রোহী অফিসারদের সপরিবারে বিদেশ প্রেরণ সে শর্তে রাজি করাতে চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলেন। কিন্তু ঢাকা থেকে বিভিন্ন অজুহাতে সময় ক্ষেপণ শুরু হলো।

ঢাকার সঙ্গে আলোচনা চলছে। রাত ১০টার দিকে লে. কর্নেল মতি, লে. কর্নেল মাহবুব, মেজর মোজাফফরসহ আরও কয়েকজন এসকেপ কোনো পথে, কীভাবে করা হবে সে আলোচনায় বসলেন। একজন অমুক্তিযোদ্ধা অফিসারও তখন তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। ধারণা করা হয়, সেই ব্যক্তিই পালানোর প্ল্যানটি ফাঁস করে দেন। প্ল্যান করা শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। ক্লান্তিতে ভেসে আসছে সবার শরীর। পরাজয়ের বিষয়টি আরও ক্লান্ত করে দিয়েছে মনকে। রাত ১টার দিকে জে. মঞ্জুরকে জানানো হলো যে, সবাইকে পালাতে হবে। সামনে আর অন্য কোনো রাস্তা খোলা নেই।

অবাক হয়ে তাকালেন মঞ্জুর ওদের দিকে। ‘এ মুহূর্তে সবাইকে ছেড়ে পালানোর প্রশ্নই আসে না’—বললেন মঞ্জুর। অনেকটা জোর করেই মেজর মোজাফফর মে. জে. মঞ্জুরকে টেনে তুললেন জিপে। সঙ্গে জেনারেলের সিকিউরিটি অফিসার মেজর রেজা। অভ্যুত্থান হওয়ার পর থেকে বাসায় যাওয়া হয়ে ওঠেনি মঞ্জুরের। রাত ১টারও কিছু পর বাসায় ঢুকলেন তিনি সঙ্গে মেজর মোজাফফর। মেজর রেজা রয়ে গেলেন গাড়িতে।

মঞ্জুরের বাসার ড্রয়িংরুমে বসে আছেন মেজর মোজাফফর। ‘স্যার আপনি কি জাতির উদ্দেশে কিছু বলতে চান’—জিজ্ঞেস করলেন মোজাফফর। একটু চিন্তা করে সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন মঞ্জুর। ক্যাসেট রেকর্ডারে তাঁর একটা ১৫ মিনিটের ভাষণ রেকর্ড করা হলো। ক্যাসেটে অভ্যুত্থানের আরম্ভ থেকে সব ঘটনাই খোলাখুলি বললেন মঞ্জুর। সেনাবাহিনীর ভেতরে জে. এরশাদ কি ধরনের ষড়যন্ত্র করেছেন তাও জানালেন। মেজর মোজাফফর দেশবাসীর কাছে প্রচারের জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের এক অফিসারের মাধ্যমে ক্যাসেটটা চট্টগ্রাম রেডিওতে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু তা প্রচারিত হলো না। সেই ক্যাসেট প্রচারিত না হওয়ার কারণ আজও অজানা থেকে গেছে।

গাড়ির ভেতর ঘুমিয়ে পড়েছিলেন মেজর রেজা। দরজা খোলার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল তাঁর। দেখলেন জে. মঞ্জুর এবং মেজর মোজাফফর উঠলেন গাড়িতে। ড্রাইভার গাড়ির ফ্ল্যাগ খুলে ফেলল এবং স্টার ঢেকে দিল। মঞ্জুর নিজের কাঁধ থেকে খুলে ফেললেন ব্যাজ। একটু শব্দ করে স্টার্ট নিল গাড়িটা। রওনা হয়ে গেল হাটহাজারির দিকে।

এর কিছুক্ষণ আগের ঘটনা। জেনারেল মঞ্জুরের এসকেপ রুটের খবর গোপনে পেয়ে সেনাভর্তি তিনটি ট্রাক মেজর মান্নানের নেতৃত্বে সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে গেল একই পথে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা