ফেনী সোনাগাজীর আলোচিত নুসরাত জাহান রাফী হত্যা মামলায় আদালতের রায়ে খালাসের আদেশ পাওয়া আরও আটজন গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার ও মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিট থেকে পর্যায়ক্রমে তারা কারাগার থেকে মুক্তি পান। এর আগে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) একই মামলায় খালাস পাওয়া রুহুল আমিন ও মাকসুদ আলম প্রকাশ মাকসুদ কাউন্সিলর চট্টগ্রাম ও ফেনী জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান। এর মধ্য দিয়ে মামলায় খালাসপ্রাপ্ত ১০ আসামির সবাই কারামুক্ত হলেন।
গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মো. জাকির হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, মুক্তির যাবতীয় কাগজপত্র কারাগারে এসে পৌঁছালে তা যাচাই-বাছাই করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে মঙ্গলবার তাদের আট জনকে পর্যায়ক্রমে মুক্তি দেওয়া হয়।
মুক্তিপ্রাপ্তরা হলেন মো. শামীম, হাফেজ আব্দুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, আফসার উদ্দিন, ইমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার উদ্দিন রানা, আব্দুর রহিম শরীফ এবং কামরুন্নাহার মনি।
স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মুক্তির খবরে সকাল থেকেই তাদের স্বজনরা কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের মূল ফটকে অপেক্ষা করতে থাকেন। কারাগার থেকে বের হয়ে স্বজনদের কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। পরে পরিবারের সদস্য ও শুভাকাক্সক্ষীদের সঙ্গে দেখা করে ফেনীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।
মুক্তিপ্রাপ্ত কামরুন নাহার মনির সঙ্গে তার সাত বছরের মেয়ে মোবাশ্বিরা খানম রাথিও কারামুক্ত হয়েছে। মাকে গ্রেপ্তারের পর রাথি কারাগারে জন্মগ্রহণ করে। মুক্তি পেয়ে মনি তদন্ত সংস্থা পিবিআইয়ের ওসি শাহ আলমের বিরুদ্ধে রিমান্ডে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন এবং গর্ভের সন্তান নষ্ট করার হুমকি দিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ করেন। তিনি মামলাটি পুনঃতদন্ত করে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানান।
মুক্তিপ্রাপ্ত ইফতেখার উদ্দিন রানার মা হাজেরা বেগম বলেন, আমার ছেলেকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে ছিল। আল্লাহর কাছে লাখো-কোটি শুকরিয়া, আমার ছেলেকে বুকে ফিরে পেয়েছি। এমনভাবে যেন আর কোনো মায়ের সন্তান মিথ্যা মামলায় কারাবাস না করে।
এর আগে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম জেলা কারাগার থেকে রুহুল আমিন এবং ফেনী জেলা কারাগার থেকে মাকসুদ আলম প্রকাশ মাকসুদ কাউন্সিলর মুক্তি পান। মুক্তির পর তারা পরিবার-পরিজন ও শুভাকাক্সক্ষীদের সঙ্গে দেখা করে ঢাকায় চলে যান বলে পারিবারিক সূত্রে জানা যায়।
রুহুল আমিন সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি এবং সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন গভর্নিং বডির সহসভাপতি ছিলেন। তার বাড়ি চরচান্দিয়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান পাড়া এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে তার স্বপরিবার যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন।
অন্যদিকে মাকসুদ আলম চর গণেশ এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত আহসান উল্যাহর ছেলে। তিনি সোনাগাজী পৌরসভার তৎকালীন কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
মুক্তির বিষয়ে রুহুল আমিনের চাচাতো ভাই রানা এবং মাকসুদ আলমের ছেলে জয় পরিবারের পক্ষ থেকে স্বস্তি প্রকাশ করে বলেন, সময় লাগলেও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে আমরা ন্যায় বিচার পেয়েছি। আল্লাহর দরবারে লক্ষ কোটি শুকরিয়াÑআলহামদুলিল্লাহ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নুসরাত জাহান রাফী হত্যা মামলায় রুহুল আমিন, মাকসুদ আলম প্রকাশ মাকসুদ কাউন্সিলর, আফসার উদ্দিন, মহিউদ্দিন শাকিল, হাফেজ আব্দুল কাদের, মোহাম্মদ শামীম, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বন্দি কামরুন্নাহার মনির খালাসের আদেশ ফেনী জেলা কারাগারে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টার দিকে পৌঁছায়। আদেশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কারাগারগুলোতে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই ও মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রথমে ১৪ সেপ্টেম্বর মাকসুদ আলম ও রুহুল আমিন এবং পরদিন ১৫ সেপ্টেম্বর কাশিমপুর থেকে বাকি আটজন মুক্তি পান।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় মামলা হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে তাঁর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের তৎকালীন বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশীদ এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। চারজন আসামির যাবজ্জীবন এবং ১০ জন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।