• সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৩ পূর্বাহ্ন
Headline
আত্মগোপনেই মারা গেলেন গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফেনীতে অধিকার’র ৩২ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর মতবিনিময় সভা ৪৭ বছর পর ফিরছে ‘গ্রাম সরকার’ পরশুরামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৯ দোকান পুডে ছাই-ক্ষতি প্রায় ২ কোটি টাকা আশুলিয়ার ঝুট গোডাউনে আগুন, ছড়িয়ে পড়ছে বাসাবাড়িতে ৭০০ রিকশার মালিকানা নিয়ে জবাব দিলেন গোলাম পরওয়ার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে চার মানদণ্ডে প্রার্থী বাছাই করবে বিএনপি; ঝুঁকি এড়াতে প্রস্তুত রাখবে বিকল্প প্রার্থী ডিমের উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্যমূল্য নেই খামারির-বিশ্ব ডিম দিবস আজ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হলেন ব্যারিস্টার গিয়াস উদ্দিন রিমন ‘জমি লিখে না দিলে কবরও হবে না’—বৃদ্ধকে কৃষক দল নেতার হুমকির অভিযোগ

ডিমের উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্যমূল্য নেই খামারির-বিশ্ব ডিম দিবস আজ

Reporter Name / ১৫ Time View
Update : শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬

প্রতিদিন ৬ কোটি ডিম উৎপাদন, এক দশকে ৬৮ শতাংশ
শীর্ষ ২০ দেশে বাংলাদেশ, প্রাপ্যতায় নেই

দেশে এক দশকে ডিমের উৎপাদন বেড়েছে ৬৮ শতাংশের বেশি। বর্তমানে প্রতিদিন ছয় কোটির বেশি ডিম উৎপাদিত হচ্ছে। সস্তা ও সহজলভ্য প্রাণিজ প্রোটিনের এই বিপুল জোগানের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে প্রান্তিক খামারিদের কাছ থেকে। অথচ উৎপাদনের এই সাফল্যের বিপরীতে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। বছরের বড় একটি সময় উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন খামারিরা। ফলে জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন ও মাথাপিছু প্রাপ্যতা বাড়লেও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের বড় অংশকে কোনো রকমে টিকে থাকতে হচ্ছে লোকসান সামলে।

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে ডিমের উৎপাদন ছিল এক হাজার ৪৯৩ কোটি পিস। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে দুই হাজার ৫০৯ কোটি পিস। অর্থাৎ এক দশকে উৎপাদন বেড়েছে এক হাজার ১৬ কোটি পিস বা ৬৮ শতাংশের বেশি।

এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ছয় কোটি ৮৭ লাখের বেশি ডিম উৎপাদিত হওয়ার কথা। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাবে বর্তমানে মাথাপিছু বার্ষিক ডিমের প্রাপ্যতা প্রায় ১৩৭ থেকে ১৪০টির বেশি। জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা- এফএওর নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের বছরে অন্তত ১০৪টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন। সেই হিসাবে বাংলাদেশ ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তার সীমা অতিক্রম করেছে।

২০৩০ সালের মধ্যে মাথাপিছু প্রাপ্যতা ২০০টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের এই অগ্রগতির সাথে খামারির আয়-ব্যয়ের হিসাব মিলছে না। বর্তমানে খামারি পর্যায়ে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ পড়ছে কমপক্ষে ১০ টাকা ৫০ পয়সা। অথচ অনেক সময় এর চেয়েও কম দামে তা বিক্রি করতে হচ্ছে। বিপরীতে ঢাকার বাজারে ফার্মের বাদামি ডিম বর্তমানে ১৩ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ উৎপাদন খরচের চেয়ে ভোক্তাকে অন্তত দুই টাকা ৫০ পয়সা বেশি দিতে হলেও সেই বাড়তি অর্থের বড় অংশ উৎপাদনকারীর হাতে যাচ্ছে না।

ফিডের দামে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, পোলট্রি শিল্পের মোট ব্যয়ের ৫০ শতাংশের বেশি খাদ্যের পেছনে যায়। ফিডের পাশাপাশি বাচ্চা, ওষুধ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় ডিম উৎপাদনের খরচও ঊর্ধ্বমুখী। এর সাথে রয়েছে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব। গাজীপুর সদরের পোলট্রি খামারি আবদুর রহমান জানান,

গত ২০ থেকে ২৫ দিনে বিভিন্ন প্রাণিজ খাবারের দাম কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। ৫০ কেজির এক বস্তা ফিডের দাম সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা বেড়ে তিন হাজার ৬৭৫ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ব্রান ও ভুট্টার দাম। ৫০ কেজির এক বস্তা ব্রানের দাম এক হাজার ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার ৮০০ টাকা হয়েছে। ভুট্টার দাম কেজিতে ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৩৭ টাকা হয়েছে। তার ভাষায়, ‘এই অবস্থায়ও ডিমের উৎপাদন খরচের চেয়ে কমে আমাদের ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে। কারণ আমরা বাজার মূল্য নির্ধারণ করতে পারি না। বাজার যেভাবে দাম ঠিক করে দেয়- সেটির ওপরই আমাদের ভরসা করতে হয়।’

খামারি থেকে বাজার- দামের ব্যবধান
প্রান্তিক খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) তথ্যানুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত লেয়ার খামারের সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে নিবন্ধিত খামার ২০ হাজার ৪৬৪টি।

বিপিআইএর সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, ডিমের দাম বাড়ার জন্য অনেক সময় খামারিদের দায়ী করা হলেও বাস্তবে খামার থেকে বাজার পর্যন্ত আসার পথে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী রয়েছে। তাদের কারণে প্রতিটি ডিমে দুই টাকা বা তারও বেশি যুক্ত হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। তার মতে, সরকারকে এমন সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করতে হবে যাতে খামারিরা সরাসরি বাজারে ডিম দিতে পারেন। পাশাপাশি ফিডের দাম কমানোর উদ্যোগও জরুরি।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল- বিপিআইসিসির আহ্বায়ক মশিউর রহমান বলেন, বছরের বেশির ভাগ সময়ই খামারিরা উৎপাদন খরচ তুলতে পারেন না। সরকারের হিসাবে উৎপাদন ব্যয়ের তালিকা থাকলেও কম দামের সময়ে খামারির জন্য সর্বনিম্ন বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয় না। অথচ দাম বেড়ে গেলে ভোক্তার স্বার্থে সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করা হয়। ফলে উৎপাদনকারীর ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হচ্ছে না।

চার মাসে ০৯ এলাকায় বিক্ষোভ
ফিডের দাম বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে ডিম বিক্রির প্রতিবাদে গত জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় খামারিরা পথে নেমেছেন। রাজশাহী, গাজীপুর, পাবনা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, নরসিংদী, ঢাকা, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহে মানববন্ধন, বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ডিম ভেঙে প্রতিবাদ এবং স্মারকলিপি দেয়ার কর্মসূচি হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে ফিডের দাম কমানো, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর হ্রাস এবং ডিম-মুরগির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়। ওই সময় অনেক এলাকায় উৎপাদনকারীরা মাত্র ৮ থেকে ৯ টাকা দরে প্রতিটি ডিম বিক্রি করেছেন বলে খামারিদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খামারি লোকসান হলেও সহজে উৎপাদন বন্ধ করতে পারেন না। ডিম দেয়ার উপযোগী মুরগি তৈরিতে আগে থেকেই বড় বিনিয়োগ করতে হয়। একবার উৎপাদন শুরু হলে বাজারদর কমে গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে খামার বন্ধ করার সুযোগ থাকে না। ফলে লোকসান মেনে নিয়ে অপেক্ষা করতে হয়- কখন বাজারদর বাড়বে।
উৎপাদনে শীর্ষ ২০ দেশে বাংলাদেশ, প্রাপ্যতায় নেই
পুষ্টির অন্যতম সহজলভ্য উৎস ডিম। উচ্চমানের প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ এই খাবার শিশুদের শারীরিক ও মস্তিষ্কের বিকাশ, প্রাপ্তবয়স্কদের পেশি গঠন এবং সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডিম উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ ২০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪তম। এফএওর ২০২৪ সালের ‘ঐবহ বমমং রহ ংযবষষ, ভৎবংয’ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম অবস্থানে চীন, উৎপাদন তিন কোটি আট লাখ ৫৬ হাজার ৮০০ টন (প্রায় ৬১ হাজার ৭১৪ কোটি পিস)। উৎপাদনে দ্বিতীয় ভারত, ৮১ লাখ এক হাজার ৮৮৫ টন (প্রায় ১৪ হাজার ৭৩১ কোটি পিস) এবং তৃতীয় ইন্দোনেশিয়া ৬৫ লাখ ৭৯ হাজার ৩৫৩ টন (প্রায় ১৪ হাজার ৬২১ কোটি পিস)।

এরপর রয়েছে- যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, মেক্সিকো, রাশিয়া, জাপান, তুরস্ক, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, কলম্বিয়া, বাংলাদেশ, স্পেন, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান ও ফিলিপাইন। ২০২৪ সালে এফএওর হিসাবে বাংলাদেশের উৎপাদন ছিল ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টন, পিসের হিসাবে প্রায় এক হাজার ৬৬২ কোটি। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাবে দেশের উৎপাদন প্রায় দুই হাজার ৪৪৬ কোটি ৫০ লাখ পিস।

মাথাপিছু প্রাপ্যতা বিশ্বের কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের অনেক ওপরে। এফএওর ২০২৩ সালের তথ্যানুযায়ী বেলজিয়ামে বছরে মাথাপিছু প্রায় ৫৩০টি ডিমের সমপরিমাণ প্রাপ্যতা রয়েছে। এরপর হংকং ৪৭২, লুক্সেমবার্গ ৪২৫, ম্যাকাও ৩৯৯, চীন ৩৮৩, মালয়েশিয়া ৩৬১, মেক্সিকো ৩৫৯, গ্রেনাডা ৩৫৬, ইন্দোনেশিয়া ৩৪৮, মালদ্বীপ ৩৩৬, জাপান ৩২৯, আর্জেন্টিনা ৩০৭, নেদারল্যান্ডস ২৯৮, প্যারাগুয়ে ২৮৭, রাশিয়া ২৮১, ডোমিনিকান রিপাবলিক ২৭৯, বেলারুশ ২৭৮, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ ২৭৪, ইউক্রেন ২৬৯ এবং জার্মানি ২৬৫টি। অর্থাৎ উৎপাদনে শীর্ষ ২০ দেশে বাংলাদেশের নাম থাকলেও প্রাপ্যতায় নেই।

বিশ্ব ডিম দিবসের ৩০ বছর
ডিমের পুষ্টি, সহজলভ্যতা ও খাদ্যনিরাপত্তায় ভূমিকা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ১৯৯৬ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশন- আইইসি বিশ্ব ডিম দিবস পালনের উদ্যোগ ঘোষণা করে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার দিবসটির ৩০তম বার্ষিকী। এবারের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য- ‘প্রোটিন দ্যাট পাওয়ার্স অ্যান্ড প্রোটেক্টস’- অর্থাৎ শক্তি জোগায় ও সুরক্ষা দেয় যে প্রোটিন।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতর, ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের বাংলাদেশ শাখা ও বিপিআইসিসি যৌথভাবে দিবসটি পালন করছে। ‘ডিমে পুষ্টি, ডিমে শক্তি, ডিমে আছে রোগমুক্তি’ স্লোগান শোভাযাত্রা, সেমিনার ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুষ্টিবিষয়ক প্রচারের পাশাপাশি এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে বিনামূল্যে ডিম বিতরণের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। ‘এগউইন’ নামে মাসকটের মাধ্যমেও সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা