আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে শুধু ভোটের লড়াই নয়, নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাইয়ের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারলেই ভবিষ্যতে একক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়ানোর ভিত্তি তৈরি হবে। তাই জোট রাজনীতিতে থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রস্তুতির মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চায় দলটি।
এনসিপি মনে করছে, আদর্শ প্রচারের চেয়ে বর্তমানে সংগঠন বিস্তার বেশি জরুরি। দলের সাংগঠনিক অবস্থা বোঝার জন্য অত্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
এদিকে, ১১ দলীয় ঐক্যের সূত্র মতে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সিটি করপোরেশনগুলোতে কেন্দ্রীয়ভাবে সমঝোতা হলেও ইউনিয়ন পরিষদেগুলোতে জোট থেকে থেকে কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে না। জোটের দলগুলো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে নিজেদের সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ পাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনি পরিচালনা কমিটির সভাপতি সারজিস আলম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “নির্বাচনি জোট হিসেবে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার পর এখন আমরা সংসদে বিরোধী দল হিসেবে একসাথে কাজ করছি। যা সংসদ থেকে শুরু করে রাজপথে রাজনৈতিক জোটের প্রতিফলন। যেহেতু বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের ইস্যুগুলোতে স্বেচ্ছাচারিতা করছে সেক্ষেত্রে আমাদের একসাথে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ।”
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, “স্থানীয় নির্বাচনে জোটগতভাবে নির্বাচন হবে কিনা সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই আমরা এককভাবে স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এতে করে যেমন আমাদের মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচনে প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট সময় পাবে তেমনি মাঠ পর্যায়ে সংগঠনের ভিত্তি শক্তিশালী হবে। তবে স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে নির্বাচন করলে স্বাভাবিকভাবেই মাঠ পর্যায়ে জোটের বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হবে। কারণ একদল অপর দলের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। সে ক্ষেত্রে জোটে প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কতটুকু প্রভাব পড়বে সেটা সময়ই বলে দেবে।”
জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটের ভবিষ্যত সম্পর্কে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “রাজনীতি একটা জটিল ও কুটিল বিষয়। রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সুবিধা অসুবিধা ক্ষমতা বিন্যাস অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সংসদ নির্বাচনের পূর্বে এরকম গুজব শোনা যাচ্ছিল যে বিএনপির সঙ্গে এনসিপি জোট করবে। তারা বেশি আসন চেয়েছে। সেই আসনের প্রতিযোগিতায় বিএনপির সামর্থ্য, সদিচ্ছা বা সুযোগ ছিল না। কিন্তু এনসিপির দাবি ও বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যাওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে তারা জোট করেছে। এখন তাদের একটা গ্রহণযোগ্যতা হয়েছে।”
তিনি আরো বলেন, “এখন সামনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপির ১০০ উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌরসভা মেয়র পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তবে আমার মনে হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের জোট হয়ে নির্বাচন করার সম্ভাবনা কম।”
অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, “এনসিপির অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী হওয়ায় বা মধ্যপন্থি রাজনীতি যথেষ্ট জনপ্রিয় হওয়ার কারণে এনসিপিতে ভালো কিছু লোকজনকে জয়েন করতে দেখছি। এতে এনসিপির শক্তি বৃদ্ধি পাবে। তবে তার মানে এই না যে, তারা এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি পাবে। সুতরাং তাদের ওই একটা এলায়েন্সের মধ্যে থাকতে হবে। আজকে তারা ছয়জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। আগামীতে হয়তো ২৫ জন নির্বাচিত হবে। তো এইরকম একটা এলায়েন্সের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে।”
তিনি বলেন, “এই যে নতুন করে অনেকে এনসিপিতে যোগদান করছে, জামায়াতে যোগ দিচ্ছে না। এর মানে হলো যে তাদের একটা স্বতন্ত্র গ্রহণযোগ্যতা বা এখনও স্বতন্ত্র অবস্থান আছে। তবে আমি মনে করি, এনসিপি যদি ভবিষ্যতে নিজস্ব ভিত মজবুত করতে চায় তাহলে তারা যে মধ্যপন্থার কথা বলে আসছে সেটা যদি ভালো করে দেশের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয় তাহলে একটা সুযোগ রয়েছে। সুতরাং জামায়াতের সঙ্গে তারা কাজ করলেও তাদের স্বকীয়তা বজায় রাখার সুযোগ এখনো একেবারেই শেষ হয়ে যায়নি।”
সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা ও জোট রাজনীতির বাধ্যবাধকতা:
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও এক বছর পেরিয়ে এনসিপি এখনো সারাদেশে শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারেনি। দলটির শীর্ষ নেতারা এটা স্বীকার করছেন যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে আলাদাভাবে চলার মতো শক্তি সঞ্চয় করা তাদের পক্ষে এখনো সম্ভব হয়নি। এছাড়া, চলমান গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রসংস্কারের দাবির বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলতে তারা জোটগত শক্তিকেই কার্যকর মনে করছেন। এই সাংগঠনিক দুর্বলতাই মূলত তাদের জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে থাকতে বাধ্য করেছে।
এ কারণেই আদর্শিক দূরত্ব ও রাজনৈতিক বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও এনসিপি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, একক শক্তির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা এবং সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে প্রভাব ধরে রাখতে আপাতত জোটের ভেতরে থেকেই নিজেদের অবস্থান শক্ত করা তাদের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সমালোচকদের মতে, এই জোট নির্ভরতা এনসিপির ঘোষিত ‘মধ্যমপন্থি’ রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে ভবিষ্যতে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিও তৈরি করতে পারে। কারণ, তরুণ ও সংস্কারপন্থি ভোটারদের একটি অংশ এখনো দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ও দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পায়নি।
এনসিপির দলীয় সূত্র বলছে, জোট নিয়ে দলের ভেতরেও অস্বস্তি রয়েছে। বর্তমান কমিটির একটি অংশ মনে করে, জামায়াতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সম্পর্ক এনসিপির স্বতন্ত্র পরিচয় গঠনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে আপত্তিকারী অংশ এখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে প্রভাব ফেলতে পারছে না।
জামায়াত জোটের ভবিষ্যত সম্পর্কে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন শিশির রাইজিংবিডিডটকমকে বলেন, “আমরা এখন জোটগতভাবে আছি এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশগ্রহণ করার কথা রয়েছে। তবে আমাদের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একটা আকাঙ্ক্ষা রয়েছে এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার। এই বিষয়ে জোটের ও দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের যে সিদ্ধান্ত আসবে সে অনুযায়ী নেতাকর্মীরা কাজ করার জন্য প্রস্তুত আছে। আর গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য চলমান জোটের আন্দোলনের পাশাপাশি এনসিপির এই বিষয়ে সোচ্চার রয়েছে।”