• শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫৫ অপরাহ্ন

জেলে এবং রিমান্ডে আমাকে চরম নির্যাতন করা হয়েছে

Reporter Name / ২২ Time View
Update : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জেলে এবং রিমান্ডে আমাকে চরম নির্যাতন করা হয়েছে
কারাগারে থাকা অবস্থায় নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অব্যাহতি পাওয়া যুগ্ম সদস্য সচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীর।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে এই নির্যাতনের এই অভিযোগ তোলেন তিনি।

তিনি বলেন, ৫ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলে এবং রিমান্ডে আমাকে চরম নির্যাতন করা হয়েছে। হুমকি দেওয়া হয়েছে, নির্যাতনের কথা বাইরে বললে আমার পরিবারের সদস্যদের গুম করে ফেলা হবে। এরপরও আপনাদের সামনে সত্যটা তুলে ধরতে এসেছি, আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাই না, সত্য সবার সামনে তুলে ধরতে চাই।

“বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের মাঝে সরকারের মধ্যে খুনি ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলের কালো ছায়া আগের মতোই হুবহু রয়ে গেছে, জেলে গিয়ে তার প্রমাণ আমি পেয়েছি। জীবনের ঝুঁকি রয়েছে জেনেও আমি এসব জাতির সামনে তুলে ধরতে আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি।”

অসুস্থতার কারণে কথা বলতে না পারায় পরে তানভীরের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইয়াসির আরাফাত।

লিখিত বক্তব্য তানভীর বলেন, ২ আগস্ট সাইবার সুরক্ষা আইনে আমার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, অথচ ৫ আগস্ট বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার দিনে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বগুড়া সদর থানা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফুতুন আহমেদ খান এই মামলার বাদী। ৫ আগস্ট আমাকে বগুড়ায় কারাগারের এমন একটি সেলে নেওয়া হয়, যেটি চরম অপরিচ্ছন্ন এবং আলোবাতাসহীন। কারেন্টও নেই একটা ফ্যানও নেই। কারারক্ষীরাও আওয়ামী লীগের। তাদের বেশিরভাগই সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের এবং তারা আমাকে জুলাই জঙ্গি বলে গালিগালাজ করতো, আশপাশের কয়েদিরাও সন্ত্রাসী সংগঠন আওয়ামী লীগের আসামি। তারাও যা তা বলে সম্বোধন করতো।

তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্ট যেদিন প্রথম জেলে নেওয়া হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে সবাইকে ভালো খাবার দেওয়া হলো কিন্তু আমাকে দু’দিনের পচা খাবার দেওয়া হলো। কারাগারে এমন পচাবাসি খাবার দেওয়া হতো যা খাওয়ার অযোগ্য। একপর্যায়ে আমার ডায়রিয়া হয়ে যায়। চিকিৎসার জন্য শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় আমাকে। সেখানে যে ওষুধ লিখেছেন ডাক্তার সেটা আমাকে দেওয়া হয়নি, খুলে দেওয়া অজানা ওষুধ আমাকে খেতে হয়েছে।

শরীরে অসংখ্য ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কীসের ইনজেকশন তা আমি জানি না। অন্তত ৭০/৮০টি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে আমাকে। সারাক্ষণ জ্বর থাকত, আর তারা আমাকে ইনজেকশন দিত। একদিন হাত পা কাপতেছিল, ডাক্তার এসে ইনজেকশন দিল এবং আমার ডান হাত আর ডান পা অবশ হয়ে গেল, বাধ্য হয়ে শহীদ জিয়া মেডিকেলে নিয়ে গেল। ডাক্তার সেখানে বলেছে, আমার স্ট্রোক হয়েছে কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ বলল— না, স্ট্রোক করেনি, কিছুই হয়নি।

মেডিকেলে আমার সিটি স্ক্যান করানো হলো রিপোর্ট কী এলো জানি না, কারা কর্তৃপক্ষ বললো কোনো সমস্যা নেই, সব ঠিক আছে। পরে বলল এমআরআই করাতে হবে, শহীদ জিয়া মেডিকেলের এমআরআই মেশিনটা নষ্ট, তারপরও সেখানে আমাকে ঢুকালো। আমি ওটার ভেতরে থাকা অবস্থায় বিকট আওয়াজ হয়ে সেটি বন্ধ হয়ে গেল। আমার কোমর থেকে পা পর্যন্ত প্যারালাইজড হয়ে গেল। আমি ১০/১২ ঘণ্টা অজ্ঞান ছিলাম। পরে দেখি শহীদ জিয়া মেডিকেলের প্রিজন সেলে এবং আমার শরীরে প্রস্রাব-পায়খানা। একজন কোনোরকমে পরিষ্কার করে দিল।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, উন্নত চিকিৎসার কথা বলে আমাকে ঢাকায় আনা হয়। কেরাণীগন্জে যেখানে রাখা হলো ওটাও খুবই খারাপ সেল। পিজি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আনা হলো, এদিক সেদিক ঘুরায় শুধু। এখানে ডাক্তার দেখিয়ে জেলে নেওয়ার সময় গাড়িতে হঠাৎ সাদা পোশাকে কয়েকজন লোক উঠে আসে, তারা আমাকে টর্চার করে।

‘টর্চারের সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং সালাউদ্দিন আম্মারের নাম ধরে ধরে বলা হতো জুলাইয়ের সবাইকে এরকম নির্যাতন করা হবে। ওখানে যে কক্ষে আমাকে রাখা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের লোকজন কীভাবে আছে তা দেখা যেত। তারা রাজার হালে জেলখানায় আছে, মোবাইল ফোনে কথা বলে, ভালো খাবার খায়, পরিবারের লোকজনের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করে। রাতের বেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের গাড়িতে করে বাইরে নেওয়া হয় এবং ভোরে আনা হয়, এটা আমি দেখেছি। এই দেখাটাই হয়তো আমার জন্য কাল হয়েছে।’

তিনি বলেন, আমার ওপর এতটাই নির্যাতন করা হয়েছে যে, বর্তমানে আমার প্রস্রাব-পায়খানা ব্যাগে ও প্যাডে করতে হচ্ছে। একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি আছি, আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে, জানি না চিকিৎসার কী হবে। মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে আছি, আপনাদের কাছে দোয়া চাই এবং দোয়া করি, আমার সঙ্গে যা করা হয়েছে, আর কারও সঙ্গে যেন করা না হয়।

এনসিপি সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্য সচিব ডা. আব্দুল আহাদ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে গাজী সালাহউদ্দিন তানভীরকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় তার ওপর যে ধরনের অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে, চিকিৎসক সমাজের পক্ষ থেকে আমরা এটিকে অত্যন্ত লজ্জাজনক ও উদ্বেগজনক ঘটনা হিসেবে দেখছি।

তিনি বলেন, আমরা তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে অজ্ঞাত ইনজেকশনের চিহ্ন দেখতে পেয়েছি। গলা, কোমর, পা– শরীরের বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০টিরও বেশি ইনজেকশনের মার্ক আমরা পেয়েছি। তাকে কী ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে, কেন দেওয়া হয়েছে, এর মেডিকেল ইন্ডিকেশন কী ছিল, কিংবা তাকে ইনজেকশন দেওয়ার সময় কোনো চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন কিনা– এসব বিষয়ে আমরা কোনো সন্তোষজনক তথ্য পাইনি।

তিনি আরও বলেন, আমরা জানতে চাই, তাকে এই ইনজেকশন কে দিয়েছেন? কোন চিকিৎসক দিয়েছেন? তার নাম ও পরিচয় কী? কেন দেওয়া হয়েছে এবং এর চিকিৎসাগত প্রয়োজনীয়তা কী ছিল?

“আমরা আরও দেখেছি, তার শরীরে ইলেকট্রিক শকের চিহ্ন রয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ইলেকট্রিক শক দেওয়ার মার্ক আমরা পেয়েছি। আয়নাঘরে নির্যাতনের যে ধরনের বর্ণনা আমরা অতীতে শুনেছি– চেয়ারে বসিয়ে ইলেকট্রিক শক দেওয়ার অভিযোগ, সেই ধরনের ঘটনা কি আমরা জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশেও আবার দেখতে পাচ্ছি? যদি ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে কেন দেওয়া হয়েছে? এর কোনো মেডিকেল ইন্ডিকেশন ছিল কিনা– আমরা সেটিও জানতে চাই।’

এই চিকিৎসক বলেন, আমরা তার নিউরোলজিক্যাল ইভালুয়েশন করেছি। শারীরিক পরীক্ষায় আমরা বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিকতা পেয়েছি। ইলেকট্রিক শক ও ইনজেকশনের চিহ্নের পাশাপাশি তার সেনসরি লেভেল পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ডরসাল বা থোরাসিক ১২ নম্বর ভার্টিব্রার পর থেকে নিচের অংশে তার সেনসেশন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

তিনি বলেন, তিনি তার পা নড়াচড়া করতে পারছেন না। এছাড়া তার প্রস্রাবের নিয়ন্ত্রণও পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। তাকে ক্যাথেটারাইজ করা হয়েছে। চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিউরোজেনিক ব্লাডারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাকে ক্যাথেটার দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান নিউরোলজিক্যাল দুর্বলতাগুলো কবে এবং কতটা পুনরুদ্ধার হবে, সেটি এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় জানিয়ে চিকিৎসক বলেন, ইলেকট্রিক শকের প্রভাবে শুধু মেরুদণ্ডের স্পাইন নয়, স্পাইনের নার্ভ রুট এবং পেরিফেরাল নার্ভও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি বর্তমানে কিছু বিষয় স্বাভাবিক থাকলেও ভবিষ্যতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আমরা এই ঘটনার একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র তদন্ত দাবি করছি। কীভাবে তিনি গ্রেপ্তার হলেন, পুলিশ হেফাজতে তার সঙ্গে কী ঘটেছে, তার শরীরে ইনজেকশনের চিহ্ন ও ইলেকট্রিক শকের চিহ্ন কীভাবে এলো, কে বা কারা তাকে এসব করেছে এবং এর পেছনে কোনো চিকিৎসাগত কারণ ছিল কিনা– এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা